
হক আমীন:
ইট পাথরের নগরী ঢাকা। চারদিকে সুউচ্চ ভবন, যানবাহনের কোলাহল আর ব্যস্ত নাগরিকজীবন। প্রকৃতির সান্নিধ্য যেখানে ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে, সেখানে রাজধানী ঢাকার উত্তরায় নিজের বাসার ছাদে এক টুকরো সবুজের রাজ্য গড়ে তুলেছেন উম্মে আমারা (৫২)। শখের বসে শুরু করা তাঁর এ ছাদ বাগান এখন পরিবারের আনন্দ, প্রশান্তি ও পুষ্টির উতে্সা।
২০১৯ সালে ছাদ বাগান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন উম্মে আমারা। এরপর ধীরে ধীরে সেখানে জায়গা করে নেয় আম, আমড়া, ডালিম, পেঁপে, তেঁতুল, পেয়ারা, লেবু , বেল, মাল্টা, খেজুর, কাঁঠাল, তেজপাতা, বেগুন, ঢেরশ, করোলা, মিষ্টআলু, মেটে আলু, কলমী শাক, পুই শাক, সজিনা, কচু, বরবটি, সীম, লাউ, শশা, মরিচসহ নানা শাকসবজির গাছ। তাঁর যত্ন আর ভালোবাসায় ছাদের অনাবাদি জায়গাটি এখন সবুজে ভরা এক ছোট্ট বাগান।
উম্মে আমারা একজন আদর্শ গৃহিণী। সংসারের নিত্যদিনের দায়িত্ব পালনের পর অবসর সময়টুকু তিনি ব্যয় করেন বাগান পরিচর্যায়। গাছের গোড়ায় পানি দেওয়া, মাটি পরিচর্যা করা, নতুন চারা লাগানো কিংবা গাছ বেড়ে ওঠা পর্যবেক্ষন—এসব কাজের মধ্যেই খুঁজে পান আনন্দ। তৃপ্তি। তাঁর কাছে বাগান পরিচর্যা কেবল শখ নয়, বরং অবসর কাটানোর এক প্রশান্তিময় অনুষঙ্গ।
তাঁর বাগানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক বারোমাসি ফল গাছ। গাছে নতুন মুকুল আসা এবং ফল পাকার দৃশ্য তাঁকে প্রতিবারই নতুন করে আনন্দিত করে। প্রকৃতির এ উপহার যেন তাঁর নিরলস পরিচর্যারই এক মধুর প্রতিদান। বছরে বারবার ফল দেওয়া গাছগুলো তাঁর কাছে বিশেষ প্রেরণার উতে্সা।
ছাদ বাগানের সুফলও পাচ্ছন হাতেনাতে। পরিবারের জন্য লেবু, মরিচ ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি বাগান থেকেই সংগ্রহ করা যায়। ফলে এসব পন্য বাজার থেকে কেনার প্রয়োজন এখন অনেকটাই কমে গেছে তাঁর। এতে যেমন পরিবারের খরচ সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি নিজের বাগানের উতপাদিত টাটকা শাকসবজি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
উম্মে আমারার স্বামী মোক্তারহোসেন। তিনি একটি ঔষধ কোম্পানির উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। তাঁদের দুই ছেলে মেয়েও মায়ের এ উদ্যোগে বেশ খুশি। পরিবারের সদস্যদের কাছে ছাদ বাগানটি যেন ভালো লাগার এক বিশেষ জায়গা। ফলের গাছ আর শাকসবজির সমারোহে সাজানো এ বাগান তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে যোগ করেছে ভিন্ন এক আনন্দের মাত্রা।
নগর জীবনে সবুজের অভাব একটি বড় বাস্তবতা। বাড়ির ছাদ, বারান্দা কিংবা অব্যবহৃত জায়গায় পরিকল্পিত গাছ লাগানো গেলে সেই অভাব কিছুটা হলেও পূরন করা সম্ভব। ছাদ বাগান একদিকে যেমন বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, অন্যদিকে ফল ও সবজি উতপাদনের মাধ্যমে পরিবারের পুষ্টি ও খরচ সাশ্রয়েও ভূমিকা রাখে। বলেন, রংপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আফতাব উদ্দিন। পাশাপাশি গাছপালা নগরের পরিবেশকে আরও সবুজ করে তুলতে সহায়তা করে।
উম্মে আমারার সাত বছরের এ উদ্যোগ তাই কেবল ব্যক্তিগত শখের গল্প নয়, এটি নগর জীবনে আত্মনির্ভরতা ও পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।
তিনি বলেন, তাঁর দেখাদেখিতে প্রতিবেশী অনেকেই নিজ নিজ বাসার ছাদে বাগান গড়ে তুলেছেন। এতে প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক আরও নিবিড় হচ্ছে। উম্মে আমারার ছাদ বাগান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সবুজের জন্য প্রয়োজন হয় না বিশাল কোন জমির। প্রয়োজন শুধু আগ্রহ, ভালোবাসা আর নিয়মিত যত্ন। ইট পাথরের নগরীতেও যে ফলানো যায় স্বপ্নের সবুজ, উত্তরার ছাদে উম্মে আমারার বাগান তারই সুন্দর উদাহরণ।