
—ড. মীর মোঃ আনোয়ার হোসেন
মধ্যপ্রাচ্য আবারও জ্বলছে। এই জনপদের বালুকাবেলায় ইতিহাস বহুবার যুদ্ধের রক্তাক্ত পদচিহ্ন এঁকেছে, বহুবার মরুভূমির বাতাস বারুদের গন্ধে ভারী হয়েছে, বহুবার ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মানবতা নিজেকেই প্রশ্ন করেছে। কিন্তু ইরান, ইসরাইল ও আমেরিকাকে ঘিরে বর্তমান সংঘাত নিছক আরেকটি আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা নয়; এটি এক বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক বিস্ফোরণ, যার অভিঘাত সীমান্তের কাঁটাতার ডিঙিয়ে বিশ্ববাজার, জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্য নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক ভারসাম্যের শিরায় শিরায় কাঁপন তুলতে সক্ষম। এই সংঘাতের সবচেয়ে শঙ্কাজনক দিক হলো, এটি আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্রে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ধীরে ধীরে বিশ্ব-অনিশ্চয়তার নতুন প্রতীকে পরিণত হচ্ছে। যে আগুন আজ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ লেলিহান করে তুলেছে, তার ধোঁয়া আগামীকাল বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে, প্রতিটি অর্থনীতিতে, প্রতিটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে, এমনকি সাধারণ মানুষের নিত্যজীবনের দরজায় কড়া নাড়তে পারে।
ইরান ও ইসরাইলের বৈরিতা আজকের নয়; এর শিকড় প্রোথিত ইতিহাসের গভীরে, রাজনৈতিক আদর্শের সংঘাতে এবং নিরাপত্তা-আতঙ্কের দীর্ঘ ছায়ায়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরান নিজেকে পশ্চিমা আধিপত্য ও ইসরাইলি নীতির বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধী বলয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। অপরদিকে, ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং লেবানন, সিরিয়া, ইরাকসহ আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর বিস্তৃত প্রভাবকে তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি ও অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। ফলে দুই রাষ্ট্রের এই দ্বন্দ্ব কখনোই কেবল সীমান্ত বা কূটনৈতিক বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি বহু বছর ধরে এক নীরব কিন্তু নির্মম ‘ছায়াযুদ্ধ’-এর রূপ নিয়েছিল,.গুপ্তহত্যা, সাইবার হামলা, সিরিয়া ও লেবাননে প্রক্সি আঘাত, সমুদ্রপথে নাশকতা, কূটনৈতিক চাপ এবং কৌশলগত ধ্বংসযজ্ঞের বহুমাত্রিক অধ্যায়ে যার প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু ইতিহাসের এক পর্যায়ে এসে সেই ছায়া আর ছায়ায় থাকেনি; সময়ের স্রোত তার মুখোশ খুলে দিয়েছে। আজ সেই সংঘাত আর অদৃশ্য অন্ধকারের অন্তরালে নয়, এটি এখন প্রকাশ্য, প্রত্যক্ষ এবং বহুমুখী এক অগ্নিসংঘাতে রূপ নিয়েছে।
বর্তমান সংকটের গভীরে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, ফিলিস্তিন প্রশ্ন, গাজা যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া, আঞ্চলিক মিত্রশক্তির সক্রিয়তা এবং বৃহৎ শক্তির কৌশলগত অবস্থান। ইসরাইল যখন একের পর এক হামলা চালায় ইরান-সমর্থিত অবকাঠামো বা মিত্রগোষ্ঠীর ওপর, তখন ইরান এটিকে শুধু নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে নয়, বরং মর্যাদা, প্রতিরোধ এবং প্রভাব-রাজনীতির প্রশ্ন হিসেবে দেখে। অপরদিকে, আমেরিকা ইসরাইলের নিরাপত্তা-ছাতার অন্যতম প্রধান বাহক হিসেবে এই সংঘাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এমন এক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে যুদ্ধের প্রতিটি ধাপ হয়ে ওঠে হিসাবি, কিন্তু একই সঙ্গে বিপজ্জনক; কৌশলগত, কিন্তু একই সঙ্গে অপ্রত্যাশিত বিস্ফোরণের ঝুঁকিতে ভরা।
এই সংঘাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও উদ্বেগজনক দিক হলো, এটি কেবল আকাশে মিসাইলের পাল্টাপাল্টি গর্জন কিংবা সীমান্তে সামরিক শক্তির প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীরে স্পন্দিত হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতির এক অতিসংবেদনশীল স্নায়ুকেন্দ্র। সেই কেন্দ্রের নাম, হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের জ্বালানি মানচিত্রে এটি নিছক একটি সংকীর্ণ জলপথ নয়; এটি বিশ্ব জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনী, যার মধ্য দিয়েই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রবাহিত হয়। ফলে হরমুজে সামান্য উত্তেজনাও কেবল আঞ্চলিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে থাকে না; তা মুহূর্তেই বিশ্ববাজারে অস্থিরতার ঢেউ তোলে, জ্বালানির দামে কাঁপন ধরায়, বাণিজ্যের স্রোত ব্যাহত করে এবং অর্থনীতির হিসাব-নিকাশকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দেয়। হরমুজ কেবল একটি সামুদ্রিক পথ নয়; এটি যেন বিশ্ব অর্থনীতির গলার শিরা। আর সেই শিরায় যদি যুদ্ধের নিষ্ঠুর আঙুল চেপে বসে, তবে শ্বাসরোধে কাতর হবে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, সমগ্র পৃথিবী।
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা যে কোনো বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য তাৎক্ষণিক বিপদের বার্তা। তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব কেবল গাড়ির জ্বালানি ট্যাংকে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পৌঁছে যায় পরিবহন খরচে, শিল্প উৎপাদনে, বিদ্যুৎ ব্যয়ে, কৃষির উপকরণে, খাদ্য সংরক্ষণে, এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। যুদ্ধক্ষেত্রে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র শেষ পর্যন্ত নীরবে এসে আঘাত করে বাজারের সবজির দামে, চাল-ডালের দামে, ওষুধের দামে, এমনকি গরিব মানুষের রান্নাঘরের আগুনেও। যে আগুন মরুভূমিতে জ্বলে, তার উত্তাপ অনেক দূরের ঘরেও পৌঁছে যায়।
শুধু জ্বালানি নয়, এই সংঘাত বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্যও এক বড় হুমকি। সমুদ্রপথে বাণিজ্য ব্যাহত হলে কাঁচামাল, শিল্পপণ্য, খাদ্যশস্য, জ্বালানি, সবকিছুর আমদানি-রপ্তানিতে ধাক্কা লাগে। বীমা ব্যয় বাড়ে, শিপিং খরচ বাড়ে, ডেলিভারি সময় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের মতো দেশ, যার অর্থনীতি বহুলাংশে বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে যুক্ত, এই অস্থিরতার অভিঘাত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। দূরের যুদ্ধ, কাছের সংকট হয়ে ফিরে আসতে আজ আর সময় নেয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় খাদ্য নিরাপত্তার নতুন আশঙ্কা। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে কৃষি উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়ে, সেচ, সার, যান্ত্রিক চাষ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ। ফলে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে, বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, এবং নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশ্ব ইতোমধ্যে একাধিক যুদ্ধ, মহামারি-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং জলবায়ু সংকটের প্রভাবে নাজুক অবস্থায় রয়েছে; এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি বড় যুদ্ধ খাদ্যবাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এই সংঘাত আঞ্চলিক সীমানা অতিক্রম করে বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে গড়াতে পারে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী, উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামো, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, সব মিলিয়ে এই যুদ্ধের চারপাশে রয়েছে বহুস্তরীয় বিস্ফোরক বাস্তবতা। একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি অতিরিক্ত হামলা, একটি কৌশলগত ভুল হিসাব, এসবই বৃহত্তর অগ্নিকাণ্ডের সূচনা ঘটাতে পারে। বিশ্বযুদ্ধ সবসময় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে আসে না; কখনো কখনো তা আসে ভুল বোঝাবুঝির ছদ্মবেশে, প্রতিশোধের যুক্তি নিয়ে, বা নিরাপত্তার নামে আক্রমণের আড়ালে। এই যুদ্ধের মানবিক মূল্যও কম নয়; বরং সেটিই সবচেয়ে বেশি। যুদ্ধ মানে শুধু সেনা নিহত হওয়া নয়; যুদ্ধ মানে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে বিদ্যুৎহীনতা, স্কুলের শ্রেণিকক্ষে ধ্বংসস্তূপ, শিশুদের শৈশব ভেঙে যাওয়া, মায়েদের কোলে শূন্যতা, মানুষের ঘরছাড়া হওয়া, শরণার্থীশিবিরে জীবন কাটানো। ইতিহাস সাক্ষী, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি বড় যুদ্ধ শুধু মানচিত্র বদলায়নি, বদলে দিয়েছে মানুষের স্মৃতি, সভ্যতার নৈতিকতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাবোধ।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের ভূমিকা কী হওয়া উচিত? প্রথমত, তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি। গোলাবর্ষণের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয় না; মিসাইলের শব্দে কূটনীতির ভাষা হারিয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সংলাপ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসি, ওমান, কাতার, তুরস্ক, যেসব পক্ষ তুলনামূলকভাবে মধ্যস্থতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, তাদের আরও সক্রিয় ও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে হবে। তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালীকে আন্তর্জাতিক নিরাপদ করিডর হিসেবে সুরক্ষিত রাখার জন্য জরুরি বৈশ্বিক সমন্বয় প্রয়োজন। জ্বালানি সরবরাহকে যুদ্ধের অস্ত্রে পরিণত হতে দিলে এর মূল্য দেবে সমগ্র বিশ্ব।
চতুর্থত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আমেরিকার কৌশলগত অবস্থান, এই ত্রিমুখী বাস্তবতাকে সামনে রেখে একটি নতুন, হালনাগাদ, কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। পুরনো অবিশ্বাসের ওপর নতুন শান্তি দাঁড়ায় না। পঞ্চমত, প্রক্সি যুদ্ধের রাজনীতি বন্ধ না করলে এ অঞ্চলে শান্তি কেবল কাগজে থাকবে, বাস্তবে নয়।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই সংঘাত কেবল দূরদেশের যুদ্ধের সংবাদ নয়; এটি এক গভীর সতর্কবার্তা, এক নীরব কিন্তু প্রবল ধাক্কা। আমরা হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রের ধোঁয়ার নিচে দাঁড়িয়ে নেই, কিন্তু সেই ধোঁয়ার গন্ধ আমাদের বাজারে, আমাদের অর্থনীতিতে, আমাদের নিত্যজীবনের শিরায়-উপশিরায় পৌঁছে যেতে দেরি হয় না। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে যদি আগুন জ্বলে, তার উত্তাপ ঢাকার রান্নাঘরেও এসে লাগে। জ্বালানি আমদানির ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন খরচের উল্লম্ফন, শিল্প উৎপাদনের ব্যাহত গতি, সব মিলিয়ে এই সংঘাতের প্রতিধ্বনি আমাদের অর্থনীতির দেয়ালে স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা, জ্বালানি উৎসের বিচক্ষণ বৈচিত্র্য, কৌশলগত মজুদের সুরক্ষা, বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি এবং কূটনীতিতে সংযত কিন্তু দৃঢ় ভারসাম্য। রাষ্ট্রকে যেমন আগাম প্রস্তুতির বর্ম পরতে হবে, তেমনি জনগণকেও দায়িত্বশীলতার শপথ নিতে হবে, গুজবের আগুনে ঘি না ঢেলে, আতঙ্কের ঢেউ না তুলে, অযথা মজুতদারির অন্ধ প্রতিযোগিতায় না নেমে, স্থিরতা ও সচেতনতার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। কারণ দূরের যুদ্ধ, আজকের বিশ্বে, খুব দ্রুতই ঘরের ভেতরের সংকটে রূপ নিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত একটি সত্যই ক্রমে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে, ইরান, ইসরাইল ও আমেরিকার এই সংঘাত কেবল তিনটি রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধ দ্বন্দ্ব নয়; এটি এক বিপজ্জনক সংকেত, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আধুনিক বিশ্বে কোনো যুদ্ধ আর স্থানীয় থাকে না। আজকের পৃথিবী যেন এক অভিন্ন নৌযান, যার এক প্রান্তে আগুন লাগলে অন্য প্রান্তে ধোঁয়ার ছায়া পৌঁছাতে বাধ্য। কারণ বিশ্ব এখন পরস্পর-নির্ভরতার অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা; এক অঞ্চলের অস্থিরতা খুব দ্রুতই অন্য অঞ্চলের স্থিতিকে কাঁপিয়ে দেয়। ইতিহাসের কঠিন অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, যুদ্ধের প্রথম শিকার সত্য, দ্বিতীয় শিকার মানবতা, আর শেষ শিকার হয়ে ওঠে মানুষের স্বপ্নময় ভবিষ্যৎ। যখন মিসাইলের গর্জন আকাশ ছিন্ন করে, তখন নীরবে ভেঙে পড়ে সভ্যতার বিবেক, আর ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে যায় আগামীর সম্ভাবনা।
অতএব, সময়ের দাবি আজ নিঃসন্দেহে একটিই অস্ত্রের অহংকার নয়, সংযমের সাহস; প্রতিশোধের উন্মত্ত রাজনীতি নয়, ন্যায়ভিত্তিক কূটনীতির প্রজ্ঞা; আধিপত্যের অন্ধ প্রদর্শন নয়, মানবতার পুনরুদ্ধারের মহৎ অঙ্গীকার। ইতিহাস বহুবার প্রমাণ করেছে, শক্তি দিয়ে ভূখণ্ড দখল করা যায়, কিন্তু শান্তির হৃদয় জয় করা যায় না; ভয় দেখিয়ে সাময়িক নীরবতা চাপিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু স্থায়ী স্থিতি নির্মাণ করা যায় না। যে সভ্যতা কেবল যুদ্ধের ভাষা শেখে, সে একদিন অনিবার্যভাবে নিজেরই গড়া ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে দেখে, তার বিজয়ের মুকুট আসলে পরাজয়ের ছাইয়ে গড়া। পৃথিবী আজ আরেকটি অগ্নিকুণ্ড চায় না, আরেকটি রক্তাক্ত দিগন্তও নয়; পৃথিবী চায় সংলাপের টেবিল, সংযমের প্রজ্ঞা, ন্যায়ের আলোকবর্তিকা এবং এমন এক মানবিক ভোর, যেখানে ধ্বংসের ধোঁয়া নয়, শান্তির সূর্যোদয় আকাশ ভরিয়ে তোলে।
(লেখক: গ্রন্থকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও শিক্ষক, চান্দাশ ডিগ্রি কলেজ, মহাদেবপুর, নওগাঁ।)