
—ড. মীর মোঃ আনোয়ার হোসেন
মিসাইলের আগুন নেভে, কিন্তু কূটনীতির অগ্নিপরীক্ষা কি শেষ হয়? যুদ্ধ কখনো কেবল বারুদের গন্ধে লেখা হয় না; যুদ্ধ লেখা হয় মানচিত্রের ভাঁজে, কূটনীতিকের নীরব হাসিতে, তেলের দামের গ্রাফে, আর পরাশক্তির গোপন দরকষাকষির টেবিলে। ইরান–আমেরিকা উত্তেজনার সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি সেই পুরনো সত্যটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। বন্দুক থামলেই যুদ্ধ থামে না; অনেক সময় তখনই শুরু হয় প্রকৃত যুদ্ধ, শর্ত, চাপ, প্রভাব ও প্রাধান্যের যুদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের ঘোষিত ১০ দফা নিছক কোনো প্রস্তাব নয়; এটি এক অর্থে আত্মসম্মানের কূটনৈতিক ভাষ্য, আবার অন্য অর্থে সময়ের হিসাব কষে ফেলা এক বাস্তববাদী রাষ্ট্রকৌশল। প্রশ্ন তাই স্বাভাবিক, এ কি ইরানের বিজয়? নাকি আমেরিকার কৌশলী বিরতি? আরও গভীরে গেলে প্রশ্নটি দাঁড়ায়, এ যুদ্ধবিরতি কি শান্তির দরজা, নাকি পরবর্তী ঝড়ের আগে কেবল সাময়িক নিস্তব্ধতা?
মাঠে মিসাইল, টেবিলে মানচিত্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বরাবরই এক অদ্ভুত দ্বৈততার নাম। আকাশে যখন ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে যায়, তখন মাটির নিচে কূটনৈতিক সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়। ইরানের ১০ দফা ঠিক সেই সুড়ঙ্গেরই এক মানচিত্র, যেখানে আছে আগ্রাসনবিরোধী নিশ্চয়তা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পারমাণবিক অধিকার স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ, আঞ্চলিক মার্কিন উপস্থিতি কমানো, এমনকি হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও। এখানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে আত্মসমর্পণের ভাষা ব্যবহার করেনি; বরং শর্তারোপের ভাষা ব্যবহার করেছে। যে রাষ্ট্রকে দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা, চাপ, একঘরে করার নীতিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, সেই রাষ্ট্র যদি যুদ্ধের টেবিলে এসে বলে, বিরতি চাই, কিন্তু আমার শর্তে, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক উভয় দিক থেকেই একটি শক্ত অবস্থান। এখানেই ইরানের প্রথম সাফল্য। যুদ্ধের শিকার হয়েও তারা আলোচনার ভাষায় নিজেদের অভিযুক্ত নয়, পক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।
ইরানের ১০ দফা দুর্বলতার আর্তি নয়, চাপের পাল্টা ভাষা। কেউ কেউ ইরানের ১০ দফাকে দেখছেন সংকটে পড়া এক রাষ্ট্রের শেষ মুহূর্তের সমঝোতা-চেষ্টা হিসেবে। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। কারণ, এই ১০ দফার প্রতিটি শর্তের ভেতরে লুকিয়ে আছে একাধিক বার্তা। আমরা আছি, এবং টিকে আছি। আমরা চাপের মুখে নত হইনি। আমাদের আঞ্চলিক প্রভাব অস্বীকার করে যুদ্ধ থামানো যাবে না। হরমুজকে পাশ কাটিয়ে বিশ্ববাজার বাঁচানো যাবে না। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাষ্ট্রকে শায়েস্তা করা গেলেও আত্মপরিচয় মুছে ফেলা যায় না। বিশেষত, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, এই দুটি দাবি কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন।
এখানে ইরান যেন বলছে, তোমরা আমাদের দুর্বল করতে পারো, কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেড়ে নিতে পারো না। এই অবস্থানকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ইতিহাস সাক্ষী, যে রাষ্ট্র যুদ্ধের টেবিলে নিজের সার্বভৌমত্বকে আলোচনার কেন্দ্রে আনতে পারে, সে রাষ্ট্র সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কূটনৈতিকভাবে পরাজিত নয়। যুদ্ধের ময়দানে ট্যাংক, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, এসবই শক্তির দৃশ্যমান ভাষা; কিন্তু আলোচনার টেবিলে শর্তারোপের সাহস, সেটিই প্রকৃত রাজনৈতিক শক্তির সূক্ষ্মতম প্রকাশ।
ইরান ঠিক সেই ভাষাতেই কথা বলছে, নতজানু হয়ে নয়; বরং প্রতিরোধের মেরুদণ্ড সোজা রেখে। তবে কি আমেরিকা হারল? এর উত্তরও এত সহজ নয়, উত্তরটি যতটা আবেগে সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা সরল নয়। যুদ্ধবিরতির পর অনেকেই আবেগে বলছেন, "ইরান শর্ত দিল, আমেরিকা মানল; অতএব এটি ইরানের বিজয়।" কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি কখনো এত সরল গাণিতিক সমীকরণে চলে না। এখানে দুই আর দুই মিলে সব সময় চার হয় না; কখনো তা হয় প্রভাব, কখনো সময়ক্ষেপণ, কখনো কৌশলগত পুনর্বিন্যাস, কখনো বা আসন্ন বৃহত্তর চালের পূর্বপ্রস্তুতি।
আমেরিকা যদি এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দিয়ে থাকে, তবে তার অর্থ মোটেও এই নয় যে ওয়াশিংটন নতি স্বীকার করেছে। পরাশক্তির রাজনীতিতে নীরবতা সবসময় দুর্বলতার লক্ষণ নয়; অনেক সময় সেটিই হয় সবচেয়ে হিসাবি কৌশল। বরং এও হতে পারে, ওয়াশিংটন ঠান্ডা মাথায় উপলব্ধি করেছে, এই মুহূর্তে পূর্ণমাত্রার সংঘাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার মূল্য, তার সম্ভাব্য কৌশলগত অর্জনের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল। কারণ, এই সংঘাত কেবল দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার সামরিক টানাপোড়েন নয়; এর কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, বিশ্ব অর্থনীতির স্পন্দিত ধমনী, জ্বালানি প্রবাহের সেই সংকীর্ণ অথচ অপরিহার্য জলপথ, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক শিল্পসভ্যতার এক বিশাল অংশ। এই পথ যদি রুদ্ধ হয়, তবে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আকাশই অন্ধকার হবে না; কম্পন ছড়িয়ে পড়বে ইউরোপের বাজারে, এশিয়ার কারখানায়, এমনকি আমেরিকার নিজস্ব অর্থনৈতিক শিরায়ও। তেলের দামে এক ফোঁটা আগুন পড়লেই তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে মুদ্রাস্ফীতির গ্রাফে, শেয়ারবাজারের অস্থিরতায়, জ্বালানি নিরাপত্তার শঙ্কায়, সরবরাহব্যবস্থার টানাপোড়েনে, এমনকি সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রার ব্যয়ে। অর্থাৎ, হরমুজে অচলাবস্থা মানে কেবল সমুদ্রপথে জাহাজ থেমে যাওয়া নয়; এটি মানে বিশ্ব অর্থনীতির শিরায় রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়া। এমন বাস্তবতায় আমেরিকার কাছে যুদ্ধবিরতি পরাজয়ের প্রতীক নয়; বরং এটি ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখার, বাজারকে স্থিতিশীল রাখার, এবং বৃহত্তর কৌশলগত অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখার এক সুপরিকল্পিত বিরতি। সুতরাং, এই বিরতিকে যদি কেউ সরলভাবে পিছু হটা বলে ব্যাখ্যা করেন, তবে তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতির সূক্ষ্ম পাঠ এড়িয়ে যাচ্ছেন। কারণ পরাশক্তিরা অনেক সময় যুদ্ধ থামায় শান্তির জন্য নয়; বরং যুদ্ধকে আরও অনুকূল শর্তে ফিরিয়ে আনার জন্য। তাই আমেরিকার কাছে যুদ্ধবিরতি মানে পরাজয় নয়; বরং ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের হিসাবি বিরতি।
দাবার বোর্ডে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় কখনো কখনো এমন এক চাল দেন, যা ওপর থেকে দেখে আত্মত্যাগ মনে হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেটিই হয় পরবর্তী জয়ের ভিত্তিপ্রস্তর। অনেক সময় একজন দক্ষ দাবাড়ু তাৎক্ষণিক ক্ষতি মেনে নেন বৃহত্তর অবস্থান রক্ষার জন্য। একটি ঘুঁটি সরিয়ে দেন, যাতে পুরো খেলাটি তার নিয়ন্ত্রণের ভেতর থাকে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নির্মম দাবার বোর্ডেও ঠিক তেমনটিই ঘটে। আমেরিকা হয়তো বুঝেছে, এই মুহূর্তে একধাপ পিছু হটা মানে পরাজয় নয়; বরং সেটিই হতে পারে পরবর্তী চাপ, নতুন অবরোধ, কিংবা আরও হিসাবি কূটনৈতিক আঘাতের জন্য অনুকূল ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। অর্থাৎ, আজকের নীরবতা হয়তো আগামী দিনের আরও সংগঠিত উচ্চারণের ভূমিকামাত্র। পরাশক্তিরা খুব কমই আবেগে বিরতি নেয়; তারা বিরতিও নেয় কৌশলে, নীরবতাও বেছে নেয় পরিকল্পনায়। এই বাস্তবতায় দেখা যায়, ইরান তার শর্তগুলো সামনে এনেছে আত্মমর্যাদার ভাষায়, রাষ্ট্রসত্তার দৃঢ় উচ্চারণে; আর আমেরিকা সেই বিরতিকেই ব্যবহার করছে সময়, পরিসর ও কৌশলগত অবস্থান পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে। এখানে উভয় পক্ষই নিজেদের বয়ানকে বিজয় হিসেবে বিক্রি করতে চাইবে।
ইরান–আমেরিকা উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে আবারও ফিরে এসেছে সেই হরমুজ প্রণালী। হরমুজে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ব অর্থনীতির কপালে ভাঁজ ফেলে। ইরান এই বাস্তবতা খুব ভালো করেই জানে। তাই হরমুজ প্রশ্নে তাদের কণ্ঠ কেবল আঞ্চলিক আধিপত্যের ভাষা নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির গলায় রাখা এক কৌশলগত হাত। অন্যদিকে, আমেরিকাও জানে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি দেখানো যায়, কিন্তু হরমুজকে অগ্রাহ্য করা যায় না। এ কারণেই যুদ্ধের ময়দানে আগ্রাসী ভাষা থাকলেও, কূটনীতির টেবিলে আসে নরম সুর।
যুদ্ধবিরতি মানেই শান্তি নয়, এটি বিরতির রাজনীতি। সবচেয়ে বড় ভুল হবে যদি কেউ মনে করে, চুক্তি হয়েছে, তাই বিপদ কেটে গেছে। না, বিপদ কেবল পোশাক বদলেছে। মিসাইলের ভাষা কিছু সময়ের জন্য নীরব হয়েছে, কিন্তু নিষেধাজ্ঞা, প্রক্সি রাজনীতি, পারমাণবিক চাপ, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, এসবের কোনোটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এই যুদ্ধবিরতি অনেকটা মরুভূমির সন্ধ্যার মতো, দূর থেকে শান্ত, কিন্তু বালুর নিচে এখনো দিনের তাপ জমে থাকে। যে কোনো মুহূর্তে তা আবার ঝড় তুলতে পারে। সুতরাং এই ১০ দফা কোনো সমাপ্তি-ঘোষণা নয়; এটি বরং নতুন অধ্যায়ের ভূমিকামাত্র। আজকের যুদ্ধবিরতি আগামী দিনের আরও বড় দরকষাকষির দরজা খুলে দিয়েছে।
কার বিজয়? সম্ভবত দু’পক্ষই নিজেদের জয়ী বলবে। বাস্তবতা হলো, ইরান বলবে, "আমরা চাপের মুখেও মাথা নত করিনি; শর্ত দিয়েছি, অস্তিত্বের প্রশ্ন সামনে এনেছি।" আমেরিকা বলবে, "আমরা বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ঠেকিয়েছি; যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণ করেছি; কৌশলগত সুবিধা অক্ষুণ্ণ রেখেছি।" অর্থাৎ, বিজয়ের ভাষা উভয় পক্ষের জন্যই আলাদা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময় কে জিতল তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কে নিজের জনগণকে বোঝাতে পারল যে সে জিতেছে। এখানেই তথ্যযুদ্ধ, বয়ানযুদ্ধ, মিডিয়াযুদ্ধের গুরুত্ব। আজকের পৃথিবীতে কেবল মাটির যুদ্ধ নয়, মনস্তত্ত্বের যুদ্ধও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা, আগুন নিভেছে, ছাই এখনো গরম।
ইরানের ১০ দফা নিঃসন্দেহে এক সাহসী কূটনৈতিক দলিল। এতে আছে প্রতিরোধের অহংকার, আঞ্চলিক বাস্তবতার স্বীকৃতি, আর রাষ্ট্রীয় মর্যাদার ভাষা। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, আমেরিকার মতো পরাশক্তি কখনো কেবল আবেগে বিরতি নেয় না; তার প্রতিটি নীরবতা, প্রতিটি স্থগিতাদেশ, প্রতিটি আলোচনাও একেকটি হিসাবি চাল। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে সঠিক মূল্যায়ন সম্ভবত এটিই, এটি কারও পূর্ণ বিজয় নয়, কারও চূড়ান্ত পরাজয়ও নয়; এটি এক অসম যুদ্ধের মধ্যে সাময়িক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার কূটনৈতিক মুহূর্ত। তবে ইতিহাসের পাঠ বলে, যে আগুন একবার মানচিত্র ছুঁয়ে যায়, তার ধোঁয়া অনেক দিন আকাশে ভাসে। আজ যুদ্ধবিরতির কলমে যে কালি শুকাচ্ছে, কাল সেটিই হয়তো আবার নতুন সংকটের রক্তিম ভূমিকায় রূপ নেবে। মিসাইলের শব্দ থেমেছে, কিন্তু প্রশ্ন এখনো বাতাসে ভাসছে, এ কি শান্তির সূচনা, নাকি আরও বড় সংঘাতের আগে কূটনীতির বিরামচিহ্ন?
(লেখক: গ্রন্থকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও শিক্ষক, চান্দাশ ডিগ্রি কলেজ, মহাদেবপুর, নওগাঁ।)