মোঃ হাসমত আলী
(শিক্ষক, কবি, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মী)
চলচ্চিত্রকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও জীবনবোধের সবচেয়ে শক্তিশালী শিল্পমাধ্যমগুলোর একটি হলো চলচ্চিত্র। সাহিত্য যেমন শব্দের মাধ্যমে মানুষের অনুভূতি প্রকাশ করে, চলচ্চিত্র তেমনি দৃশ্য, শব্দ, অভিনয় ও সংগীতের সমন্বয়ে একটি জাতির আত্মপরিচয়কে জীবন্ত করে তোলে। বাংলাদেশের বাংলা সিনেমার ইতিহাসও তেমনি এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, যেখানে রয়েছে সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, সৃজনশীলতা এবং শিল্পের প্রতি গভীর ভালোবাসার অসংখ্য গল্প।
আজকের সমৃদ্ধ চলচ্চিত্রশিল্প একদিনে গড়ে ওঠেনি। সীমিত প্রযুক্তি, আর্থিক সংকট, দক্ষ জনবলের অভাব এবং রাজনৈতিক বৈষম্যের মধ্যেও একদল দূরদর্শী মানুষ পূর্ব বাংলায় একটি স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই বাংলাদেশের বাংলা সিনেমা একদিন স্বর্ণযুগে পৌঁছায়। সেই গৌরবময় যাত্রার সূচনাপর্বই এই প্রথম পর্বের আলোচ্য বিষয়।
১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তি পায় 'মুখ ও মুখোশ'। আবদুল জব্বার খান পরিচালিত এটিই ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা সবাক চলচ্চিত্র। সীমিত প্রযুক্তি, অপ্রতুল যন্ত্রপাতি এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নির্মিত এই চলচ্চিত্র প্রমাণ করে যে ঢাকাকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। ছবিটি শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যই অর্জন করেনি, দেশীয় চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছিল।
১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন, যা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন বা বিএফডিসি নামে পরিচিতি লাভ করে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্টুডিও, ক্যামেরা, ল্যাবরেটরি, সম্পাদনা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সুবিধা গড়ে ওঠে। ফলে দেশীয় চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন গতি আসে এবং ঢাকাকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রশিল্প বিকশিত হতে শুরু করে।
এরপর একে একে নির্মিত হয় ফতেহ লোহানীর 'আকাশ আর মাটি', এহতেশামের 'এ দেশ তোমার আমার' সহ আরও অনেক চলচ্চিত্র। এসব ছবিতে উঠে আসে বাঙালির পারিবারিক জীবন, প্রেম, সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধ। বিদেশি কাহিনির পরিবর্তে দেশীয় গল্প ও বাংলার বাস্তব জীবন চলচ্চিত্রের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। দর্শকও নিজেদের জীবনকে পর্দায় আবিষ্কার করতে শুরু করেন।
ষাটের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে আবির্ভূত হন এক অসাধারণ প্রতিভা, জহির রায়হান। তিনি ছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক বলিষ্ঠ শিল্পী। ১৯৬১ সালে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র 'কখনো আসেনি' মুক্তি পায়। এরপর 'কাঁচের দেয়াল' বাংলা চলচ্চিত্রে বাস্তবধর্মী নির্মাণশৈলীর নতুন ধারা সৃষ্টি করে।
১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'সঙ্গম' ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম রঙিন বাংলা চলচ্চিত্র। পরের বছর 'বাহানা' নির্মাণের মাধ্যমে সিনেমাস্কোপ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। এর ফলে বাংলা সিনেমা প্রযুক্তিগত দিক থেকেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'জীবন থেকে নেওয়া' যদিও এই পর্বের সময়সীমার কিছুটা বাইরে, তবু ষাটের দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতা, গণআন্দোলন এবং বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পরূপ হিসেবে এটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
এই সময়েই বাংলা চলচ্চিত্রে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন রহমান, রাজ্জাক, সুভাষ দত্ত, খান আতাউর রহমান এবং আনোয়ার হোসেন। তাঁদের অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। অভিনেত্রীদের মধ্যে সুচন্দা, কবরী, সুমিতা দেবী, রোজী সামাদ ও শবনম অভিনয়ের গুণে বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেন। বিশেষ করে রাজ্জাক ও কবরী জুটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় ও সফল রোমান্টিক জুটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
বাংলাদেশের বাংলা সিনেমার জনপ্রিয়তার অন্যতম ভিত্তি ছিল এর সংগীত। খান আতাউর রহমান, আলতাফ মাহমুদ, রবিন ঘোষ, সত্য সাহা এবং সমর দাস একের পর এক কালজয়ী সুর সৃষ্টি করেন। কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমান, সাবিনা ইয়াসমিন, মাহমুদুন্নবী, আব্দুল জব্বার এবং পরবর্তী সময়ে রুনা লায়লা তাঁদের অনন্য কণ্ঠে চলচ্চিত্রের গানকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেন। সেই সময়ের বহু গান আজও সমান জনপ্রিয়।
তৎকালীন বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর গল্প। পারিবারিক সম্পর্ক, প্রেম, সামাজিক বৈষম্য, গ্রামীণ জীবন, মানবিক মূল্যবোধ, ভাষা আন্দোলনের চেতনা এবং বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন চলচ্চিত্রের কাহিনিতে গভীরভাবে স্থান পেয়েছিল। নির্মাতারা অশ্লীলতা বা কৃত্রিম চাকচিক্যের পরিবর্তে শক্তিশালী চিত্রনাট্য, অর্থবহ সংলাপ, স্বাভাবিক অভিনয় এবং হৃদয়স্পর্শী সংগীতকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ফলে সেই সময়ের অসংখ্য চলচ্চিত্র আজও দর্শকের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে।
ষাটের দশকে দেশের বিভিন্ন শহর ও জেলায় প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা বাড়তে থাকে। নতুন ছবি মুক্তি পেলেই দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যেতো। পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখা ছিল একটি আনন্দময় সামাজিক আয়োজন। বাংলা চলচ্চিত্র তখন কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, এটি মানুষের অনুভূতি, সমাজচেতনা এবং জাতীয় আকাঙ্ক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ বাহক হয়ে ওঠে।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যে শক্ত ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল, তার ওপর দাঁড়িয়েই স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বাংলা সিনেমা প্রকৃত স্বর্ণযুগে প্রবেশ করে। আবদুল জব্বার খানের পথপ্রদর্শক ভূমিকা, ফতেহ লোহানী ও এহতেশামের সৃজনশীল নির্মাণ, জহির রায়হানের অসাধারণ চলচ্চিত্রভাবনা এবং খান আতাউর রহমানের বহুমুখী অবদান বাংলা চলচ্চিত্রকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাঁদের হাত ধরেই তৈরি হয় এমন একটি চলচ্চিত্রধারা, যা আজও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের বাংলা সিনেমার এই সূচনাপর্ব শুধু চলচ্চিত্রের ইতিহাস নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপ্রতিষ্ঠা, শিল্পসাধনা এবং জাতীয় চেতনার উন্মেষের এক উজ্জ্বল দলিল। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী সময়ে রাজ্জাক, কবরী, শাবানা, ববিতা, ফারুক, বুলবুল আহমেদ, আমজাদ হোসেন, চাষী নজরুল ইসলামসহ অসংখ্য কিংবদন্তির হাত ধরে বাংলা সিনেমা তার প্রকৃত স্বর্ণযুগে প্রবেশ করে।
সেই স্বর্ণযুগের বিস্তৃত আলোচনা থাকবে বাংলাদেশের বাংলা সিনেমার সোনালী অতীত ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্বে।