বরেন্দ্রকণ্ঠ ডেস্ক
গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সামনে কোনো আইনগত বাধা নেই বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে, যা আইনগতভাবে সঠিক নয়।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীতে আয়োজিত গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ উপলক্ষে ঢাকা বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
আলী রীয়াজ বলেন, “এবারের গণভোট কোনো দলকে ক্ষমতায় আনা বা ক্ষমতায় যাওয়ার পথে বাধা দেওয়ার এজেন্ডা নয়। এটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রক্তের অক্ষরে লেখা জাতীয় সনদভিত্তিক রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন, যা বাংলাদেশের সব মানুষের।” তিনি বলেন, এই গণভোট জনগণের সম্মতি গ্রহণের একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ওপর আইনগত নিষেধাজ্ঞা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি ও আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনায় একবাক্যে মত পাওয়া গেছে—এ ধরনের প্রচারে কোনো আইনি বাধা নেই। যারা বাধার কথা বলছেন, তারা হয় বিভ্রান্ত, নয়তো ভিন্ন উদ্দেশ্যে বিষয়টি উত্থাপন করছেন।
আলী রীয়াজ বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারী নন; তারা একই সঙ্গে এ দেশের নাগরিক। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণের সেবা করা, আইন মানা, শৃঙ্খলা রক্ষা ও জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণ নাগরিক দায়িত্বের অংশ। সেই দায়িত্বের আলোকে গণভোটে মানুষকে সচেতন করা এবং ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করাও নাগরিক কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তিনি বলেন, আগামী অন্তত ৪০ বছর বাংলাদেশ কোন পথে চলবে, আজ সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ছিল, তার বিরুদ্ধে যারা সংগ্রাম করেছেন, জীবন দিয়েছেন, গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন—তারা জাতির জন্য দুটি দায়িত্ব রেখে গেছেন। এক, স্বৈরতন্ত্র যেন আর ফিরে না আসে; দুই, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের একটি সুস্পষ্ট পথনকশা তৈরি করা।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি ম্যান্ডেটের কথা তুলে ধরে আলী রীয়াজ বলেন, এগুলো হলো—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। নির্বাচন সরকার পরিচালনা করে না; সরকার কেবল অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে, আর নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। বিচারও আদালতের এখতিয়ার; সরকার শুধু বিচারপ্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে এক ব্যক্তির ইচ্ছায় সংবিধান পরিবর্তন করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় সংসদীয় কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকের পর তা পরিবর্তন করা হয়। এক ব্যক্তির ইচ্ছায় সংবিধান সংশোধনের এই সংস্কৃতি বন্ধ করাই বর্তমান সংস্কারের অন্যতম লক্ষ্য।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার বলেন, সংবিধান সংস্কার–সংক্রান্ত ৪৮টি সুপারিশ চারটি ক্যাটাগরিতে গণভোটে আসছে। কার্যত প্রশ্ন একটাই—আপনি কি জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে, না বিপক্ষে?
গণভোট ব্যর্থ হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। মনির হায়দার বলেন, “সেই ফ্যাসিবাদ কতটা নির্মম হতে পারে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।” তিনি আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে, যা গণভোটের মাধ্যমে কাজে লাগাতে হবে।
সভায় গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা। তারা বলেন, দীর্ঘদিন ভোট নিয়ে অনাস্থার কারণে গণভোট অনেকের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। তাই জনগণকে ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-এর অর্থ বোঝাতে হবে এবং ‘টিক’ চিহ্নকে কেন্দ্র করে ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিভাগের কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পূর্তসচিব মো. নজরুল ইসলাম, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিকসহ ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।


