সাগর মিয়া, রংপুরঃ
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও জাল শিক্ষাগত সনদের মাধ্যমে চাকরি নেওয়ার অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রোববার দুপুর ১২টার দিকে রংপুর দুদকের সহকারী পরিচালকের নেতৃত্বে একটি টিম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে প্রশাসনিক ভবনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দীর্ঘ সময় ধরে এ অভিযান পরিচালনা করে। দুদক সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পন্ন হওয়া বিভিন্ন পদে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে স্বচ্ছতা না থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু নিয়োগে ভুয়া ও জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে চাকরি নেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতেই দুদকের প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয় প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করে এবং তার অংশ হিসেবে এই সরেজমিন অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযান চলাকালে দুদকের কর্মকর্তারা প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে রেজিস্ট্রার কার্যালয়, সংশ্লিষ্ট শাখা এবং নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র সংরক্ষিত বিভিন্ন দপ্তরে তল্লাশি চালিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র সংগ্রহ করেন।
এ সময় নিয়োগ বোর্ডের কার্যবিবরণী, আবেদনপত্র, শিক্ষাগত সনদের অনুলিপি এবং যাচাইসংক্রান্ত নথিপত্র সংগ্রহ করা হয় বলে জানা গেছে। অভিযান শেষে দুদকের রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক বেলাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “জাল শিক্ষাগত সনদের মাধ্যমে চাকরি নেওয়ার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করতেই কমিশনের নির্দেশে আমরা এখানে এসেছি।
যেহেতু উপাচার্য প্রতিষ্ঠান প্রধান, তাই প্রথমেই তাকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “এটি একটি প্রশাসনিক বিষয় হওয়ায় আমরা রেজিস্ট্রার মহোদয়ের কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করেছি। তারা আমাদের সহযোগিতা করেছেন। ইতোমধ্যে আমরা জানতে পেরেছি, জাল সনদে চাকরি নেওয়ার দায়ে একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।”
দুদক কর্মকর্তা বেলাল হোসেন আরও বলেন, “আমরা অভিযানে আসার আগেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে, যা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতার ইঙ্গিত দেয়। অভিযোগ সত্য না হলে প্রশাসন এমন সিদ্ধান্ত নিত না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে না—এই ক্ষেত্রে দুদক আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।” তিনি জানান, অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শিক্ষাগত সনদ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ করে সেগুলো সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে যাচাই করা হবে।
যাচাই শেষে একটি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেওয়া হবে। এরপর কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্র জানায়, অভিযোগ ওঠার পরপরই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করা হয়। তদন্তে জাল সনদের তথ্য পাওয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রয়োজনে দুদকের সঙ্গে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে বলেও জানানো হয়।
দুদকের অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যাপক আলোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সমাজের অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা খুব কমই দেখা গেছে। তাদের মতে, বেরোবিতে দুদকের এই অভিযান স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
সচেতন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় একটি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। এখানে যদি জাল সনদ ও অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ হয়, তবে শিক্ষা ও প্রশাসন উভয়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। দুদক সূত্র জানায়, প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে প্রয়োজনে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করা হবে।
তদন্তে জাল সনদ, ঘুষ বা প্রভাব খাটানোর প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


