বদলগাছী সংবাদদাতাঃ
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলা সমাজসেবা অফিসের অধীন রোগী কল্যাণ কমিটির সরকারি বরাদ্দ ও কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তার জন্য বরাদ্দ থাকলেও দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে সেই সুবিধা বাস্তবে রোগীদের কাছে পৌঁছায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাগজে-কলমে ব্যয় দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে কোনো রোগী ওষুধ, চিকিৎসা সহায়তা কিংবা দাফন ব্যয়ের সহায়তা পাননি।
সমাজসেবা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে বদলগাছী সমাজসেবা অফিস রোগী কল্যাণ কমিটি ২৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ১৯ আগষ্ট ২০১২ সালে বদলগাছী সোনালী ব্যাংক শাখায় একটি হিসাব খোলে। সেইসময় উপজেলার রাজনৈতিক,ব্যবসায়ী,সাংবাদিক,চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য নিয়ে কমিটি গঠন হয়। শুরুতে তারা দু একটি সভায় উপস্থিত থাকলেও সময়ের সাথে সাথে কাউকেই কোন সভায় আর উপস্থিত থাকতে দেখা যায় নি। তালিকায় থাকা ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মেয়াদ শেষ হয়েছে বহু আগে। তারা উপজেলায় আসেন না, কিন্তু কমিটির সভায় তাদের স্বাক্ষর দেখা গেছে। ঔই তালিকায় থাকা একজন সিনিয়র সাংবাদিক মাহবুব উল ইসলাম আলমগীর কমিটি গঠনের কয়েক মাস পর মারা গেছে। নিয়মিত সভায় তার নামের স্বাক্ষরও আছে। প্রশ্ন উঠেছে তাদের স্বাক্ষর করছে কে?
কমিটিতে নাম থাকা উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আবু খালেদ বুলু,সাংবাদিক হাসানুজ্জামান হাসান,এসএম জ্যাকিতুল্লাহ সরদার,ব্যবসায়ী জীতেন্দ্রনাথ মন্ডল সহ কয়েকজনের পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের সাথে কথা বলে কমিটির সভায় স্বাক্ষর অনুদানের টাকা ও রোগীদের সেবা বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানান, বিগত আট বছর থেকে কমিটির কোন কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত নন তারা। সভার কোন প্রকার নোটিশও পায় নি তারা। তাদের স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জানান,এসব জালিয়াতি করেছে কর্তৃপক্ষ।সভায় যাওয়া হয় না,সেখানে স্বাক্ষর করবো কই থেকে। উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আবু খালেদ বুলু দেশের রাজনৈতিক পটভূমি পরিবর্তনের পর থেকে পলাতক রয়েছে।
কমিটির সদস্য সাংবাদিক হাসানুজ্জামান বলেন,“ গত ৮ বছরে কমিটির সভার কোন চিঠি পাই নি। বর্তমানে এর অস্তিত্ব আছে কি না জানা নাই। সভায় আমার স্বাক্ষর থাকলে কেউ জালিয়াতি করেছে। সাংবাদিক মাহবুব চাচা ২০১২ সালে তো মারা গেছে—সে কিভাবে স্বাক্ষর করল? এগুলো জালিয়াতি। এসব বিষয়ে নিখুঁত তদন্ত হওয়া উচিৎ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শুরুতে এক-দুটি সভা হলেও পরবর্তী সময়ে কমিটির কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম ছিল না। অথচ নথিপত্রে নিয়মিত সভা ও ব্যয়ের তথ্য দেখানো হয়েছে।মৃত ব্যক্তির স্বাক্ষরেও সভা!
কমিটির সভার নথি পর্যালোচনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তালিকাভুক্ত সিনিয়র সাংবাদিক মাহবুব উল ইসলাম আলমগীর ২০১২ সালেই মৃত্যুবরণ করেন। অথচ পরবর্তী কয়েক বছরের সভার কার্যিববরণীতে তার নামের স্বাক্ষর রয়েছে।
এ ছাড়া তালিকায় থাকা একাধিক ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়েছে, কেউ কেউ উপজেলায় বসবাসও করেন না। তবুও নথিতে তাদের উপস্থিতি ও স্বাক্ষর দেখা গেছে। এতে কমিটির সভা ও নথির সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রোগী কল্যাণ কমিটির ব্যাংক হিসাব থেকে জানা গেছে, এই কমিটির নামে ২০১২ সালে বদলগাছী শাখায় সোনালী ব্যাংকে হিসাব খোলা হয়। তার পর থেকে প্রতিবছর সরকারি বরাদ্দ পেয়েছে কিন্তু দীর্ঘ দশ বছরের টাকার কোন হদিস নেই। স্টেটমেন্ট থেকে পাওয়া গেছে ২০২৩ সালের ২৬ শে মে ১ লাখ টাকা ও ২০২৫ সালে ১৭ মে ৯০ হাজার টাকা এসেছে। ৩ জুলাই ২০২৪ সালে ৫২ হাজার,২৮ আগস্ট ২ হাজার পাঁচ শত ও ২০ এপ্রিল ৫০ হাজার মোট তিন দফায় ১ লাখ চার হাজার পাঁচ শত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। সবশেষ ব্যালেন্স রয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ১৩ বছরে প্রায় ১৩ লাখ টাকার বরাদ্দ এসেছে রোগী কল্যাণ কমিটিতে। কোন কোন অসহায় রোগীর পিছনে কতো টাকা খরচ হয়েছে। এবং রোগীকে কতো টাকার ঔষধ ক্রয় করে দেওয়া হয়েছে। তার কোন তথ্য পাওয়া যায় নি সমাজসেবা অফিসে।
কদমগাছী গ্রামের সুলতানা নামে এক গৃহবধূ বলেন, সমাজসেবা অফিস তো বয়স্কভাতা,প্রতিবন্ধী ভাতা,বিধবা ভাতা দেয় জানি। কিন্তু গরিব দুঃস্থ রোগীর জন্য ঔষধ ও খরচ দেয় এগুলো জানা নেই। অফিস না জানালে আমরা জানবো কিভাবে আর সেবাই পাবো কিভাবে।”
সদর ইউনিয়নের আলেফা বেগম নামে আরেক অসহায় বৃদ্ধা বলেন,“ কোন ঔষধ পত্র পাই না। আমার ঘরে একজন প্রতিবন্ধী ছেলে আছে সেও কোন ঔষধ খরচ পায় না। তাহলে সরকার থেকে আমরা কিছু পাবো না।”
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, ২০২৪ু২৫ অর্থবছরে কমিটির বরাদ্দ থেকে স্যালাইন সরবরাহ হয়েছে প্রায় ৫২ হাজার টাকার। এর বাইরে আগের কয়েক বছরে কী আসাুযাওয়া হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানে না।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কানিস ফারহানা বলেন,“স্যালাইন এসেছে—এ ছাড়া রোগীর চিকিৎসা ব্যয় আমরা পাইনি। কোনো রোগীকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও জানা নেই। সমাজসেবা অফিস ভালো বলতে পারবে।”
অভিযোগ শুধু বরাদ্দ লুটপাট হয়েছে এমন নয়, রোগী কল্যাণ কমিটির সভার নথিতেও প্রশ্ন উঠেছে। আরেক সদস্য এস এম জ্যাকিতুল্লাহ সরদার একজন মুসলমান কিন্তু তার বাবার নামের জায়গায় জগন্নাথ মন্ডল নামে এক হিন্দু ব্যক্তির নাম লেখা হয়েছে। এভাবেই ভূয়া কমিটি দিয়ে চলছে সরকারি বরাদ্দ লুটপাট।
বদলগাছী সমাজসেবা অফিসের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ আল মামুন বলেন,
“আমি গত মাসে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়েছি। আগের বিষয় জানি না। এখন থেকে নিয়মিত কার্যক্রম হবে।” তবে পূর্ববর্তী বরাদ্দের অর্থের সঠিক ব্যয় কোথায় হয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন: বরাদ্দ গেল কোথায়?
উপজেলার বিভিন্ন দোকান, হাসপাতাল ও কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে—১০ বছরের বেশি সময় ধরে বরাদ্দের তথ্য বাইরে আসেনি। ফলে স্থানীয়দের প্রশ্ন—
১। বরাদ্দ কোথায় গেল?
২। ভুয়া স্বাক্ষর করল কে?
৩। সভা হয়েছে কোথায়?
৪। রোগীরা সেবা না পেলে টাকার গন্তব্য কোথায়?
স্থানীয় জুলাই যোদ্ধা শুভ বলেন,“এটা সংবেদনশীল খাত। রোগীর চিকিৎসার টাকা হাওয়া,এটা মেনে নেওয়া হবে না। জুলাই স্পিরিটের সাথে যায় না। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তীব্র আন্দোলনের কথা জানালেন তিনি।”
তদন্তের আশ্বাস দিয়ে বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান ছনি বলেন,“এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।
অসহায় রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল ব্যবহারে অনিয়ম হলে তা দুর্নীতির শামিল বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তারা বলেন, স্বাস্থ্য ও মানবিক খাতে অনিয়ম হলে তা সরাসরি জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত—এ কারণে দ্রুত তদন্ত প্রয়োজন।
সৈকত সোবহান,
বদলগাছী, নওগাঁ।
০১৭০৬০২৩৩৫০


