আদমদীঘি (বগুড়া) প্রতিনিধি :
ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস আন্ত:নগর ট্রেন বগুড়ার আদমদীঘির সান্তাহারে ৯টি বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় করা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তিন পর্যায়ে দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি উঠে এসেছে। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে রাজশাহী পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের জিএম ফরিদ আহম্মেদ গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এসময় তিনি জানান, প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা এবং প্রতিষ্ঠিত রেল বিধিমালার লঙ্ঘন সুস্পষ্ট করা হয়েছে। বিশেষ করে, স্টেশন মাস্টারের পক্ষ থেকে চালককে প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা না দেওয়া এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মাধ্যমে সঠিক দূরত্বে লাল পতাকা প্রদর্শন না করাকে বড় ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ট্রেনের লোকোমাস্টারেরও সামনে থাকা সংকেত বা কাজের বিষয়ে যথেষ্ট সতর্কতার অভাব ছিল বলে জানা যায়। এই ত্রুটিগুলোর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
এর আগে চলতি মাসের গেল ১৮ মার্চ দুপুরে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি বগুড়ার সান্তাহার জংশন স্টেশন অতিক্রম করার পরপরই বাগবাড়ি এলাকায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হলে আহত হন ৬৬ জন যাত্রী। তাদের আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও নওগাঁ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফলে ওই রুটে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনায় ৬টি ট্রেনের যাত্রা বাতিল ও ৭টি ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ঘটে।
এ নিয়ে একই দিন বিকেলে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলীয় পাকশী বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিতে পাকশী বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী মইনউদ্দিন সরকারকে আহ্বায়ক করা হয়। এই কমিটি তদন্ত করে প্রতিবেদন রেলওয়ের ডিজি বরাবর পাঠিয়েছেন বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে।
জানতে চাইলে রাজশাহী পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের জিএম ফরিদ আহম্মেদ জানান, এখানে বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব অবহেলা ছিল। আমাদের যে এস্টাবলিশড রুল আছে সেটা লঙ্ঘন করা হয়েছে। রেলওয়ের কোনো জায়গায় যদি কাজ করতে হয়, তাহলে স্টেশন মাস্টারকে একটা অর্ডার ওপিটি ফর্ম ইস্যু করতে হয়। এটা ইস্যু করলে স্টেশন মাস্টার গাড়ির চালককে দিত। আবার স্টেশন মাস্টার এই ফর্মটি লোকোমাস্টারকে দিলে তাদেরও বিষয়টি জানা থাকতো। এছাড়া যেখানে কাজ হয় সেখানে স্পিড রেস্ট্রিকশন থাকে এবং গতি নিয়ন্ত্রণ থাকে। ১০-২০ কিলোমিটারের মতো গতি থাকতো। বিষয়টি লোকোমাস্টারের জানা থাকলে সচেতনভাবে সেখানে কাজ করতে পারতেন।
লোকোমাস্টারেরও দায়িত্ব আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেহেতু তাকে (লোকোমাস্টার) সবসময় সতর্ক থাকতে হবে, সামনে কি আছে না আছে। একটা লোকোমোটিভ থেকে অনেক দূর পর্যন্তই দেখা যায়। যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেখানে আগে থেকে রেলের কর্মীরা রেললাইনে কাজ করছিলেন। ওখানে ফ্ল্যাগ ছিল, তবে ফ্ল্যাগটা পর্যাপ্ত দূরত্বে ছিল না। তারপরও ফ্ল্যাগ একটু খেয়াল করলেই তিনি দেখতে পেতেন। এটা চালকের ভুল ছিল।
তিনি আরোও বলেন, ওখানে যারা কাজ করতেছেন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের যে কর্মকর্তা ওখানে দায়িত্বে ছিলেন উনারাও সঠিক দূরত্বে ফ্ল্যাগ প্রদর্শন করেননি। যে দূরত্ব আমাদের নির্ধারিত নিয়মে বলা আছে, সেই অনুযায়ী ছিল না। এই কারণে ওখানে তদন্ত কমিটি তিন পর্যায়ে (রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, লোক মাস্টার ও স্টেশন মাস্টার) দায়িত্বের অবহেলার কথা বলেছেন।
তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশের বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের অফিশিয়াল যে রুলস আছে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এজন্য অফিশিয়াল প্রসিডিংয়ে আলাদা কমিটি হবে। সেই অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কি ধরনের শাস্তি আরোপ করা হবে- সেটি নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না।


