রম্য লেখক আমিনুল হক:
রেলওয়ে স্টেশনের আবেগ আছে। এখানে মানুষ আসে, আবার চলে যায়। কেউ বিদায় নেয়, কেউ অপেক্ষা করে। কিন্তু কিছু অপেক্ষা যেন সময়ের বুকেই জমে থাকে-বছরের পর বছর।
২৫ বছর আগে, শাহেদ ও তিথির ভালোবাসার গল্পও তেমনই এক অপেক্ষার গল্প। তরুণ বয়সে দু’জন একে অপরকে গভীর ভালোবাসতেন। কিন্তু সময়, পরিস্থিতি আর পারিবারিক বাস্তবতা তাদের সেই ভালোবাসাকে পূর্ণতা দেয়নি। শেষ পর্যন্ত তাদের জীবনে নেমে আসে বিচ্ছেদ, আর দীর্ঘ নীরবতা।
সময়ের স্রোতে অনেক বছর কেটে গেছে। জীবনের রেলগাড়ি তাদের ভিন্ন ভিন্ন পথে নিয়ে গেছে। তবুও অদ্ভুতভাবে দু’জনের জীবনেই আর নতুন কোন সম্পর্ক আসেনি। কেউই বিয়ে করেনি। হয়তো হৃদয়ের গভীরে কোথাও সেই পুরোনো ভালোবাসার প্রদীপটি নীরবে জ্বলেই ছিল। হঠাত্ করেই একদিন সেই পুরোনো গল্প যেন ফিরে এল।
চড়াইকল রেলওয়ে স্টেশন-একটি ছোট্ট নিরিবিলি স্টেশন। এখানেই স্টেশন মাস্টার হিসেবে কর্মরত শাহেদ। প্রতিদিনের মতোই, সেদিনও দায়িত্ব পালন করছিলেন। ঠিক তখনই স্টেশনে এসে থামে যমুনা এক্সপ্রেস। কিন্তু ট্রেনটা ছয় ঘন্টা বিলম্ব হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে বিরক্তি আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সেই যাত্রীদের মধ্যেই ছিলেন তিথি।
হঠৎ চোখাচোখি মুহূর্তেই যেন থমকে গেল সময়। ২৫ বছরের দূরত্ব এক পলকে মিলিয়ে গেল। দু’জনেই বিস্মিত, আবেগাপ্লুত। কেউ কিছু বলতে পারছিল না। শুধু চোখের ভাষাই যেন, বলে দিচ্ছিল-অগণিত না বলা কথা।
স্টেশনের নীরব বাতাসে ভেসে উঠলো পুরোনো দিনের স্মৃতি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডা, বিকেলের গল্প, ভবিষ্যতের স্বপ্ন-সব যেন আবার ফিরে এল মনে।
দু’জনেই জানালেন, জীবনের এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও তারা আর কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে ভাবতে পারেনি। মনে ছিল হয়তো কোথাও না কোথাও একদিন আবার দেখা হবে।
সেদিন ছিল শুক্রবার চড়াইকল স্টেশনে ছয় ঘন্টা বিলম্ব হওয়া ট্রেন যেন তাদের জীবনের হারিয়ে যাওয়া সময়টুকুকেই ফিরিয়ে দিল কিছুক্ষণের জন্য। কথায় কথায় ভেসে উঠলো স্মৃতি, চোখে জমল অশ্রু।
ট্রেনের হুইসেল আবার বাজলো। যাত্রা শুরু হল নতুন করে। তিথি যাত্রী হয়ে রওনা দিলেন নিজের গন্তব্যে, আর শাহেদ দাঁড়িয়ে রইলেন প্লাটফর্মে-স্টেশন মাস্টারের দায়িত্বে। কিন্তু সেই দিনের দেখা যেন তাদের জীবনের ২৫ বছরের নীরব গল্পকে আবার নতুন করে লিখে দিল।
রেললাইন দু”টি পাশাপাশি চলে, কিন্তু এক হয় না। শাহেদ-তিথির ভালোবাসাও যেন তেমনই। পাশাপাশি স্মৃতিতে বেঁচে থাকা, কিন্তু জীবনের পথে আর এক না হওয়া। এ এক গভীর নি:শব্দ ভালোবাসা।


