বিশেষ প্রতিবেদক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার নিয়ামতপুর সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন-সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন মণ্ডল আত্মগোপনে আছেন। কিন্তু কলেজে না গিয়েও নিয়ে হাজিরা খাতায় সাক্ষর দেওয়া ও বেতন-ভাতা তোলার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
কলেজে মাসের পর মাস অনুপস্থিত থেকেও বেতন-ভাতা তোলার অনিয়মের পাশাপাশি মমতাজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য, ভর্তি ও পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়, শিক্ষক-কর্মচারিদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, বেতন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মমতাজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তি এবং কলেজের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিয়োগের দাবিতে কলেজের একদল শিক্ষার্থী গত সোমবার (৬ এপ্রিল) সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। এছাড়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রী, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েছে।
শিখার্থীদের দেওয়া স্মারকলিপি ও কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে বর্তমানে ৬ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। কলেজটিতে উচ্চমাধ্যমিক, বিএ ও বিএসসি পাস কোর্স ছাড়াও আটটি বিভাগে অনার্স (সম্মান) পড়ানো হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ২০১৫ সালে প্রভাব খাটিয়ে মমতাজ উদ্দিন মণ্ডল ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০২১ সালে কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ার হোসেন অবসর গ্রহণের পর থেকে মমতাজ উদ্দিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২০২৪ সালের ৫ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি কলেজে যান না। জুলাই আন্দোলনের সময় গাজীপুরের গাছা থানায় এক গার্মেন্টস শ্রমিক নিহতের ঘটনায় করা হত্যা মামলার আসামি মমতাজ উদ্দিন। ওই মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে ৫ আগস্টের পর থেকে মমতাজ উদ্দিন পলাতক রয়েছেন।
গত বুধবার (৮ এপ্রিল) ওই কলেজে গিয়ে দেখা যায়, ভারপ্রাপ্ত অধক্ষের কক্ষ বন্ধ। কলেজের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মমতাজ উদ্দিন মণ্ডল উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় কলেজে ও এলাকায় তাঁর অনেক প্রভাব ছিলো। তিনি সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ায় কলেজের শিক্ষক-কর্মচারিরা তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলতে পারতেন না। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। ২০ মাস ধরে মমতাজ উদ্দিন কলেজে অনুপস্থিত। তবে কলেজে অনুপস্থিত থাকলেও কিছু শিক্ষক ও কর্মচারির সহযোগিতায় হাজিরা খাতায় সাক্ষর করছেন এবং নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলছেন।
অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ আলী, চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ওবায়দুর রহমান ও রিজভী আহমেদসহ ১০-১২ জন শিক্ষার্থী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তাঁরা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে কলেজে আসতে দেখেননি। কলেজে অধ্যক্ষের পদ শূন্য। আর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষও কলেজে আসেন না। ফলে শিক্ষা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কলেজে ঠিকমতো ক্লাস হয় না। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের নির্দেশে ভর্তি ও পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে। মমতাজ উদ্দিনের সিন্ডিকেটের সদস্যরা হলেন, কলেজের প্রভাষক ওবায়দুল হক চৌধুরী, হুমায়ুন আহমেদ চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম ও মোদাচ্ছের হক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের চারজন শিক্ষক বলেন, ৫ আগস্টের পর হত্যা মামলার আসামি হওয়ায় গ্রেপ্তার এড়াতে পলাতক রয়েছেন। তবে পলাতক থাকলেও এখনো তাঁর দাপট কমেনি। আত্মগোপনে থেকেও কলেজে অনিয়ম-দুর্নীতি অব্যাহত রেখেছেন। কলেজের প্রতিটি বিভাগের শিক্ষক প্রতিনিধি নিয়ে একাডেমিক কাউন্সিল গঠিত হওয়ার কথা থাকলেও কলেজের কিছু শিক্ষক-কর্মচারী নিয়ে একটি সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভর্তি ও পরীক্ষার ফরম পূরণের নামে বেশি টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করছে। আত্মসাতের এই অর্থ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কাছেও চলে যায়। এসবের প্রতিবাদ করায় কলেজের শিক্ষকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও বেতন আটকে দেওয়ার হুমকি দেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মমতাজ উদ্দিন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও তাঁর অঘোষিত সিন্ডিকেট সদস্যদের অনিয়ম-দুর্নীতির অবসান এবং কলেজে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে শিক্ষক-কর্মচারীরা সম্প্রতি সভা করেন। ওই সভায় শিক্ষক-কর্মচারীরা কলেজে অধ্যক্ষ কিংবা প্রশাসক নিয়োগের দাবিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আত্মগোপনে থাকা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মমতাজ উদ্দিন মণ্ডল মুঠোফোনে বলেন, ‘মামলার কারণে আমি পলাতক আছি এটা সঠিক। তবে মাঝে মাঝে আমি কলেজে যাই। আর অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে কথা বলতে চাইলে সরাসরি কথা বলতে হবে। এগুলো কথা মোবাইলে বলা যাবে না৷ সাক্ষাতে কথা বলতে হবে। ‘
এ বিষয়ে নিয়ামতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুর্শিদা খাতুন বলেন, ‘কলেজের সমস্যা নিয়ে কোনো পক্ষ লিখিতভাবে আমাকে জানায়নি। তবে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ কর্মসূচি করার পর কলেজের সমস্যার বিষয়টি জানতে পারি। এ বিষয়ে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসার পরিকল্পনা রয়েছে। ‘