চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্যেও সক্রিয় মূল হোতা গডফাদার সামাদ। চলছে সোনা পাচার কোনোভাবেই তাদের ঠেকানো যাচ্ছে না। বৈধ বা অবৈধভাবে দেশে আসা সোনার সম্ভাব্য গন্তব্য প্রতিবেশী দেশ ভারতে। কারণ ২০১৩ সালের এপ্রিল থেকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে সোনার চাহিদা হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। এরপর থেকে চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে সোনা পাচারের ঘটনা বেড়ে যায় বহুগুণে। আবার অস্ত্র, মাদক ও হুন্ডির বিনিময় মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই মূল্যবান ধাতুটি। উদ্বেগজনক হারে চোরাচালান বেড়ে যাওয়ায় শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামের কিতাব আলী ছেলে সামাদ। দীর্ঘদিন ধরেই চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণ চোরাকারবারি ও হুন্ডি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এর বিপরীতে ভারত থেকে আগ্নেয়াস্ত্র,হেরোইন, নেশাজাতীয় কয়েক প্রকারের ট্যাবলেট, ফেনসিডিল, ইয়াবা, মদ সহ বিভিন্ন ধরনের মাদক দ্রব্য নিয়ে আসছে দেশে।
বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি সহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে হর হামেশাই এসব অপকর্ম চলছে। এর ফলে এলাকার কিশোর ও যুবসমাজ ধ্বংসের পথে পতিত হচ্ছে। সেইসাথে পরিবার ও সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে চরম অস্থিরতা। এই সকল স্বর্ণ ও মাদক পাচার চক্রের মূল হোতা গডফাদার কামারপাড়ার সামাদ। তার নেতৃত্বে চলছে সোনা পাচার। কোনোভাবেই তাদের ঠেকানো যাচ্ছে না।
চোরাকারবারি সামাদের বাবা কিতাব আলী পেশায় একজন কৃষক অন্যের জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ করে চালাতেন সংসার। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে পুরো পরিবার নিয়ে কষ্টে জীবন যাপন করতেন। আর্থিক অনটনে পড়ালেখায় মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। স্বর্ণ চোরাকারবারি ব্যবসায় খুলেছে সামাদ এর কপাল, অল্পদিনে হয়েছেন কোটিপতি বর্তমানে তার দুই স্ত্রীর মালিকানাধীন দুটি বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে আছে কোটি কোটি টাকা। রয়েছে দামি গাড়িও। এত গাড়ি-বাড়ি ও অর্থ যার তার দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা নেই। স্বর্ণ চোরাকারবারির ‘গুরু’ হিসেবে দেশ-বিদেশে কাজ করেন সামাদ। ভারতের শীর্ষ চার স্বর্ণ চোরাকারবারির সঙ্গে তার দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠতা। এক দশকের বেশি সময় ধরে সরাসরি স্বর্ণ চোরাকারবারিদের গডফাদার হিসেবে কাজ করলেও এর আগে কখনও তিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েননি। আর এখন পর্যন্ত সোনা চোরাচালানে জড়িত কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। কারণ সোনা চোরাচালানে শুধু বাহকরাই ধরা পড়ছেন, সামাদের মত মূল হোতারা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে,চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতরা বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা স্বর্ণ নিয়ে আসছে বাংলাদেশে। মূলত ভারতে পাচারের জন্যই বাংলাদেশে এ স্বর্ণ চোরাচালান করে আনা হচ্ছে। এরই মধ্যে স্বর্ণ চোরাচালান রুটের সবচেয়ে বড় করিডোরগুলোর একটি হয়ে উঠেছে চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত। দর্শনা থানাধীন এলাকায় সোনা ও মাদকদ্রব্যের বিনিময় বাণিজ্য রমরমা হয়ে উঠেছে। একদিকে পাচার হচ্ছে সোনা, অন্যদিকে দেশে ঢুকছে সর্বনাশা মাদকদ্রব্য ফেনসিডিল, উইনকোরেক্স, ইয়াবা, হেরোইন, কোকেন, আইসসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। পাচারকারীরা নগদ লেনদেন এড়িয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করছে। যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে সামনের দিনগুলোয় তা আরো মারাত্মক রূপ নেয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে। গডফাদার সামাদ
স্বর্ণ চোরাচালানের কাজে এরই মধ্যে অবৈধ পথে অনেক বার ভারতে গেছেন। চোরাকারবারিদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেন সামাদ। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে ভারতের স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সদস্যদের। নামে-বেনামে বিভিন্ন মোবাইল সিম থেকে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে স্বর্ণ চোরাচালান, মাদক ও হুন্ডি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে সামাদ।
দর্শনা সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রতি পিস সোনার বার ভারতে প্রবেশ করাতে পারলে পাচারকারীরা বর্তমানে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পেয়ে থাকে। একই পন্থায় আবার ওপার থেকে মাদক নিয়ে দেশের বিভন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে এই সিন্ডিকেট। মাদকের ধরন ও আকারভেদে আলাদা কমিশন পেয়ে থোকে পাচারকারীরা।
স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, কিতাব আলী ছেলে স্বর্ণ ও মাদক কারবারি সামাদের কারণে রাত নামলেই অচেনা মানুষের আনাগোনা বাড়ে এলাকায়। সীমান্ত দিয়ে আগে শুধু গরু বা বিভিন্ন পণ্য পাচার করা হতো। এখন মাদকই সবচেয়ে বেশি আসছে। শুধু এখানেই শেষ না সামাদ রাতে মদ খেয়ে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে বাইরে থেকে বিভিন্ন মেয়েদেরকে নিয়ে এসে একান্তে সময় কাটায়। স্থানীয় যুবসমাজের মধ্যে এর প্রভাব ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভারতে পাচারকালে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানাধীন কামারপাড়া সীমান্ত থেকে ৩টি স্বর্ণের বারসহ আসমা খাতুন নামে এক নারী চোরাকারবারিকে আটক করে চুয়াডাঙ্গা- ৬ বিজিবি’র সদস্যরা। সামাদের ভাষ্যমতে ৩টি স্বর্ণের বার তার নিজের। এরপর চলতি বছরের ১১ এপ্রিল দামুড়হুদা উপজেলার হৈবতপুর পাচকবর এলাকা থেকে পারকৃষ্ণপুর গ্ৰামের গোপাল হালদারের ছেলে সমর হালদারকে চার পিস স্বর্ণের বার সহ আটক করে চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি’র বাড়াদী ক্যাম্পের জওয়ানরা। এর মাত্র এক দিন পর ১৩ এপ্রিল সকাল ছয়টার সময় দর্শনা পুরাতন রেলস্টেশন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি’র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসানের নেতৃত্বে বিজিবি’র বিশেষ টহলদল দর্শনা মোবারক পাড়ার মৃত বাদল খানের ছেলে আলমগীরকে ১০ পিস স্বর্ণের বারসহ আটক করে। গোপন সূত্রে পাওয়া এক ভিডিওতে সামাদ বলে, এসকল স্বর্ণের বার গুলি তার। এবং তার কাছে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বলেও ঐ ভিডিওতে তাকে বলতে দেখা যায়।
চুয়াডাঙ্গা জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শেখ মো. হাশেম আলী বলেন, ‘সীমান্তে বিজিবির শুধু নজরদারি বাড়ালেই হবে না। চোরাচালান নিরসনে সব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা জরুরি।
বিজিবির তথ্য মতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ৯ কোটি ৭০ লাখ ৩৬ টাকার মাদক জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে ১৮ কোটি ৯১ লাখ ৬৮ হাজার ৫০৪ টাকার সোনা উদ্ধার করে বিজিবি। এ বিষয়ে বিজিবির বলেন ‘আমরা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছি। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে স্বর্ণ জব্দ করা হচ্ছে। ফলে স্বর্ণ চোরাচালান আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। এ ছাড়া মাদকের বিরুদ্ধে বিজিবি নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। প্রতিনিয়ত মাদক উদ্ধার করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সামাদ’কে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে চাঞ্চল্যকর সব তথ্যসহ তার কাছে থাকা অস্ত্র ও গুলির সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। স্বর্ণ ও মাদক ব্যবসায়ী সামাদ চোরাচালানে জড়িত হয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে আগেই। বিষয়টির প্রতি সুনজর দিয়ে প্রযোজনীয় আইনগত ব্যাবস্থা নিতে চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি ও জেলা পুলিশের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে এলাকার সচেতন মহল।


