বাংলার নিভৃত পল্লির নাম যখন উচ্চারিত হয়, তখন কোথাও যেন মাটির গন্ধে, নদীর স্রোতে আর কৃষকের ঘামে জেগে ওঠে এক অনন্ত কবিতার সুর। সেই সুরের এক মহিমান্বিত নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর তাঁর সেই স্বপ্নময় স্মৃতিধন্য ভূমিগুলোর মধ্যে পতিসর এক অনন্য অধ্যায়।
নওগাঁর নিসর্গবেষ্টিত পতিসর কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি যেন কবির হৃদয়ের এক গোপন জানালা। এখানে এসে তিনি কেবল জমিদার ছিলেন না, ছিলেন কৃষকের বন্ধু, মানুষের আপনজন, প্রকৃতির ধ্যানমগ্ন সাধক। নাগর নদীর শান্ত স্রোত, সবুজ ধানের ক্ষেত, কাশফুলের দোলা আর সন্ধ্যার নরম আলো তাঁর মনোজগতে তুলেছিল এক অপূর্ব সুরের ঢেউ। সেই ঢেউ থেকেই জন্ম নিয়েছে অসংখ্য গান, কবিতা, ভাবনা ও মানবমুখী দর্শন।
পতিসরের মাটিতে হাঁটতে হাঁটতে কবি যেন আবিষ্কার করেছিলেন বাংলার প্রকৃত আত্মা। তিনি দেখেছিলেন গ্রামের মানুষের দুঃখ, অভাব, বঞ্চনা। আবার সেই মানুষের মুখেই খুঁজে পেয়েছিলেন অনাবিল হাসি, সহজ সৌন্দর্য ও জীবনের গভীর সত্য। তাই তাঁর সাহিত্যেও বারবার ফিরে এসেছে পল্লিজীবনের রূপমাধুর্য। তিনি বুঝেছিলেন বাংলার প্রাণ লুকিয়ে আছে গ্রামে, কৃষকের ঘামে, মাটির গন্ধে।
পতিসরে বসেই রবীন্দ্রনাথ গ্রামোন্নয়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন শিক্ষিত, স্বাবলম্বী ও মানবিক এক সমাজ। কৃষকের ঋণমুক্তি, শিক্ষার প্রসার, সমবায় ব্যবস্থা, এসব ভাবনায় তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে অনেক অগ্রসর। তাঁর কাছে মানুষই ছিল শ্রেষ্ঠ সত্য। তাই পতিসরে তাঁর কর্মকাণ্ড কেবল জমিদারির প্রশাসন ছিল না, ছিল মানবকল্যাণের এক নীরব সাধনা।
বর্ষার দিনে যখন নাগর নদী উথলে উঠতো, তখন কবির মনেও যেন জেগে উঠতো গানের সুর। সন্ধ্যার আকাশে জ্বলজ্বল করা তারা, দূরের বাঁশির ধ্বনি কিংবা কুয়াশাভেজা ভোর, সবকিছুই তাঁর অনুভবে রূপ নিতো কবিতায়।
পতিসরের নিসর্গ তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে গভীর মানবিকতা ও প্রকৃতিপ্রেমের এক অনন্য দীপ্তি।
আজও পতিসরের পথে দাঁড়ালে মনে হয় কবি যেন এখানেই আছেন। হয়তো কুঠিবাড়ির বারান্দায় বসে দূরের আকাশ দেখছেন, কিংবা নাগর নদীর তীরে হেঁটে হেঁটে লিখছেন কোনো অমর গান। বাতাসে ভেসে আসে তাঁর পদধ্বনি, গাছের পাতায় বাজে তাঁর বীণার সুর।
পতিসরে রবীন্দ্রনাথ মানে শুধু একজন কবির স্মৃতি নয়, এটি বাংলার আত্মার সঙ্গে এক গভীর সংলাপ। তিনি এই মাটিকে ভালোবেসেছিলেন বলেই পতিসর আজও সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবতার এক উজ্জ্বল তীর্থভূমি হয়ে আছে। বাংলার আকাশে যতদিন ভোরের আলো ফুটবে, ততদিন পতিসরের মাটিতে রবীন্দ্রনাথের নাম উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধা, প্রেম ও অনন্ত মুগ্ধতায়।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর ১৬৫তম জন্মজয়ন্তীতে গভীর শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা নিবেদন করছি।
মোঃ হাসমত আলী
শিক্ষক, কবি, লেখক,গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী ।


