ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি
মঞ্চের আলো-আঁধারিতে যাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে, যাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছে হাজারো দর্শক, তিনি নওগাঁর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অতি পরিচিত মুখ মোঃ খাদেমুল ইসলাম। কেবল একজন অভিনেতা হিসেবেই নয়, নির্দেশক ও সংগঠক হিসেবেও তিনি নওগাঁর নাট্যচর্চাকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। ১৯৫৮ সালের ১৯ জুলাই জন্ম নেওয়া এই শিল্পী আজ আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন চারদিকে পুনর্গঠনের জোয়ার, তখন একঝাঁক বন্ধুকে নিয়ে খাদেমুল ইসলাম গড়ে তোলেন ‘সুলতানপুর তরুণ সংসদ’ নামক নাট্য সংস্থা।
১৯৭৪ সালে নওগাঁ ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমান জিলা স্কুল) থেকে এসএসসি এবং ৭৮-এ বিএমসি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করা এই মানুষটির নেশা ছিল কেবলই শিল্প। সীতেশচন্দ্র ঘোষের নির্দেশনায় ‘মাস্টারের স্বপ্ন’ নাটকের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সেই পথচলা আজও থামেনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি প্রায় ৮৫টি নাটকে অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে— আমি দালাল, শপথ, আপট্রেন, বিজ্ঞাপন, বিষের পেয়ালা, ওরা কদমআলী ও কবর। শুধু মঞ্চ নয়, ১৯৮৩ সালের ৯ মার্চ বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত আঞ্চলিক অনুষ্ঠান ‘ময়নার বিয়ে’-তে তার অভিনীত ‘ঠসা’ চরিত্রটি শহরজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল। আজও অনেকে তাকে সেই স্মৃতি থেকে স্মরণ করেন। তিনি বাহাদুর ভাই,দিলারা,শর্বরী,শাহিদা,নূরুল ইসলাম মঙ্গল ও হীরা লাল জয়সওয়ালের মতো বরেণ্য শিল্পীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি ২০টি নাটকে নির্দেশনা দিয়ে নিজের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে তিনি ‘নওগাঁ থিয়েটার’-এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন এবং বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের শাখা সংগঠন হিসেবে স্থানীয় সংস্কৃতিকে জাগ্রত রাখতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। ২০০২ সালে শিল্পকলা একাডেমি থেকে অভিনয়ের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা এই শিল্পী মনে করেন, তার এই সাফল্যের পেছনে মরহুম মমিনুল হক ভুঁটি ভাইয়ের অবদান অনস্বীকার্য। ছাত্রজীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়; ১৯৭৩ সালে ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র পরিষদের ভি.পি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে স্ত্রী, সন্তান ও নাতনিদের নিয়ে এক সুখী পরিবারের কর্তা তিনি। কর্মজীবনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থাকলেও তার মন পড়ে থাকে সুলতানপুরের সেই সবুজ প্রান্তর আর মঞ্চের কালো পর্দায়। নওগাঁর সাংস্কৃতিক আকাশকে সমৃদ্ধ করা এই গুণী ব্যক্তিত্ব আমাদের জন্য এক প্রেরণার নাম। তার এই দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার আগামী প্রজন্মের নাট্যকর্মীদের জন্য এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।


