সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা
চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের আলোচিত ও একসময় ‘সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য’ হিসেবে পরিচিত জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বড় ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির পর সেখানে দুটি পুলিশ একাডেমি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কারাগারসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
একসময় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কার্যত ‘অঘোষিত নিষিদ্ধ অঞ্চল’ হিসেবে পরিচিত ছিল জঙ্গল সলিমপুর। স্থানীয়দের ভাষায়, এলাকাটি ছিল “দেশের ভেতর আরেক দেশ”— যেখানে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছিল বিভিন্ন সন্ত্রাসী চক্র। চাঁদাবাজি, জমি দখল, অস্ত্রের মহড়া ও সংঘবদ্ধ অপরাধের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করত আতঙ্ক।
তবে চলতি বছরের মার্চ মাসে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে প্রায় ৪ হাজার সদস্যের বিশাল যৌথ অভিযান পরিচালিত হয় এলাকায়। ওই অভিযানে সন্ত্রাসীদের শক্ত ঘাঁটি ভেঙে দেওয়া হয় এবং দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর আয়তনের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। অভিযানের পর সাধারণ মানুষের চলাচল বেড়েছে, কমেছে অপরাধ প্রবণতা, এবং সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথও উন্মুক্ত হয়েছে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানিয়েছেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পুলিশ সপ্তাহে জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সেখানে দুটি আধুনিক পুলিশ একাডেমি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শুধু পুলিশ একাডেমিই নয়— এলাকাটিকে একটি নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক জোন হিসেবে গড়ে তুলতে কারাগার, নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। এতে এলাকাটির সামগ্রিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে জেলার সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পুলিশ সুপার। বিশেষ করে রাউজান এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে হত্যাকাণ্ড, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, চাঁদাবাজি ও অপহরণের ঘটনা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে বড় ধরনের বিশেষ অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
আসন্ন কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতি প্রতিরোধেও কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশ প্রশাসন। পুলিশ সুপার বলেন, গরু পরিবহনের পথে কোথাও যেন ছিনতাই, ডাকাতি কিংবা চাঁদাবাজির ঘটনা না ঘটে, সেজন্য বিশেষ নজরদারি ও টহল জোরদার করা হবে। প্রয়োজন হলে পুলিশ লাইন্স থেকে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি স্থাপনা নির্মাণের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একসময় ভয় ও আতঙ্কের জনপদ হিসেবে পরিচিত এলাকাটি ধীরে ধীরে একটি নিরাপদ ও প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে রূপ নিতে পারে। স্থানীয়রাও আশা করছেন, দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে এবার উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে জঙ্গল সলিমপুর।


