বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজ
ক্যান্সার মানেই মৃত্যুভয় নয়; বরং সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগকে অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করা সম্ভব। এমন বার্তা ছড়িয়ে দিতে নওগাঁয় অনুষ্ঠিত হয়েছে ক্যান্সার সচেতনতামূলক এক আলোচনা সভা।
গত মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টায় নওগাঁ সদর উপজেলার ইকরকুড়ি গ্রামের রহিমা বনিজ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ‘আলো ভুবন ট্রাস্টে’র উদ্যোগে “ক্যান্সার নয় আতঙ্ক, সচেতনতা, প্রতিরোধ ও প্রাথমিক চিকিৎসা” শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনগণ, চিকিৎসক, সমাজকর্মী, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সচেতনতার এক প্রাণবন্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
বিশিষ্ট সমাজ সেবক, ব্যবসায়ী ও আলো ভুবন ট্রাস্টের উপদেষ্টা মো. আহসান সাইদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. মো. আমিনুল ইসলাম। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে জার্মানি থেকে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং আলো ভুবন ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. গোলাম আবু জাকারিয়া।
অনুষ্ঠানে ক্যান্সারের উপর বিস্তারিত ভিজ্যুয়াল কীনোট উপস্থাপন করেন আলো ভুবন ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. হাসিন অনুপমা আজহারী। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সামাজিক সংগঠন একুশে পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট ডি.এম. আব্দুল বারী, সাধারণ সম্পাদক এম.এম. রাসেল, রাণী এনজিওর প্রধান নির্বাহী ও এনজিও সমš^য়ক ফজলুল হক, বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. ময়নুল হক দুলদুল, নওগাঁ জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এএসএম রায়হান আলম, সাধারণ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন, অ্যাডভোকেট শামীম আজাদ বেলালসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
জার্মানি থেকে অনলাইনে বক্তব্য প্রদানকালে অধ্যাপক ড. গোলাম আবু জাকারিয়া বলেন, “ক্যান্সার সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা ও অমূলক ভয় অনেক সময় রোগকে আরও জটিল করে তোলে। সচেতনতা, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই ক্যান্সারকে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব। আমি দীর্ঘদিন দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করেছি এবং ভবিষ্যতেও আলো ভুবন ট্রাস্ট এই মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। ”
তিনি আরও বলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে| মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে সামাজিক সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা সময়ের দাবি।
প্রধান আলোচক অধ্যাপক ড. হাসিন অনুপমা আজহারী বলেন, “বিশ্বব্যাপী ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে অধিকাংশ ক্যান্সারের সফল চিকিৎসা সম্ভব। ধূমপান থেকে বিরত থাকা, পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিভিল সার্জন ডা. মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “একসময় ক্যান্সারকে অনিবার্য মৃত্যুর সমার্থক মনে করা হলেও বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে অনেক ধরনের ক্যান্সার এখন সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। তবে এজন্য প্রয়োজন রোগ সম্পর্কে সচেতনতা, প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণ এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।”
তিনি আরও বলেন, সরকার ক্যান্সারসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে কাজ করে যাচ্ছে| পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
সভাপতির বক্তব্যে মো. আহসান সাইদ বলেন, “ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু চিকিৎসকদের নয়, এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমেই ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব। আলো ভুবন ট্রাস্ট মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
আলোচনা সভায় বক্তারা ক্যান্সার সম্পর্কে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, ভয় নয়—সচেতনতাই পারে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে| সময়মতো পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ সুস্থ জীবন ফিরে পাচ্ছেন। তাই ক্যান্সারকে লুকিয়ে না রেখে, সচেতনতার আলোয় এনে প্রতিরোধ ও চিকিৎসার পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।
অনুষ্ঠান শেষে অংশগ্রহণকারীরা এ ধরনের সচেতনতামূলক আয়োজন নিয়মিত করার দাবি জানান এবং গ্রামীণ জনপদে স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।


