রংপুর প্রতিনিধি
রংপুর নগরীতে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার পরিধি বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আসনসংকট দূর করা এবং আধুনিক শিক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৮ সালে নেওয়া হয়েছিল দুটি নতুন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্মাণের উদ্যোগ। প্রত্যাশা ছিল, বিদ্যালয় দুটি চালু হলে প্রতিবছর সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তির তীব্র প্রতিযোগিতা অনেকটাই কমবে এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে। কিন্তু প্রকল্প অনুমোদনের প্রায় আট বছর এবং নির্মাণকাজ শুরুর চার বছর পার হলেও এখনো শেষ হয়নি কোনো বিদ্যালয়ের নির্মাণ। তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার চুক্তি থাকলেও সময়সীমা অতিক্রম করেছে এক বছরেরও বেশি। ফলে বহু প্রতীক্ষিত এই শিক্ষা প্রকল্প এখনো বাস্তব রূপ না পাওয়ায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা ও ক্ষোভ। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের পর রংপুর নগরীর উত্তম মৌজার হাজীপাড়ার পুরোনো রেডিও সেন্টার এলাকায় একটি এবং কামাল কাছনা মৌজার বোতলাপাড়া এলাকায় আরেকটি আধুনিক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা প্রণয়ন ও দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে ২০২১ সালের আগস্টে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়।
২০২২ সালের মার্চে এসএসএল-এসই-এমএ জেভি নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং একই বছরের ২৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রতিটি বিদ্যালয়ের নির্মাণ ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৩ কোটি ১০ লাখ ৮ হাজার ৪৩২ টাকা। অর্থাৎ দুই বিদ্যালয়ের জন্য মোট ব্যয় প্রায় ৪৬ কোটি ২০ লাখ টাকারও বেশি। চুক্তি অনুযায়ী ৩৬ মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়নি। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, হাজীপাড়ার পুরোনো রেডিও সেন্টার এলাকায় নির্মাণাধীন বিদ্যালয়ের মূল ভবনের কাঠামো দৃশ্যমান হলেও প্লাস্টার, রঙ, দরজা-জানালা, বৈদ্যুতিক সংযোগ, স্যানিটেশন, অভ্যন্তরীণ ফিনিশিং এবং বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের বিভিন্ন উন্নয়নকাজ এখনো অসমাপ্ত। অন্যদিকে বোতলাপাড়া এলাকার বিদ্যালয়ের প্রধান অবকাঠামো প্রায় সম্পন্ন হলেও রং করা, অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক স্থাপনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং কিছু আনুষঙ্গিক কাজ বাকি থাকায় এখনই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। রংপুরে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় প্রতিবছর ভর্তি মৌসুমে হাজার হাজার শিক্ষার্থী আবেদন করলেও সুযোগ পায় অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি বিদ্যালয়ে সন্তানদের ভর্তি করাতে বাধ্য হয়।
হাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা আইরিন আক্তার বলেন, “আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বেসরকারি বিদ্যালয়ে সন্তানদের পড়ানো খুবই কঠিন। নতুন সরকারি বিদ্যালয়ের খবর শুনে আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও বিদ্যালয় চালু হয়নি। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর দাবি জানাই।
মেডিকেল মোড় এলাকার বাসিন্দা হামিদা আফরোজ বলেন, “সরকার নতুন বিদ্যালয় নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় ভেবেছিলাম সন্তানকে সরকারি স্কুলে ভর্তি করাতে পারব। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় সেই সুযোগ আর হলো না। উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো শেষ না হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ।
শিক্ষাবিদদেরও উদ্বেগ কম নয়। রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বলেন, প্রতিবছর সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ব্যাপক প্রতিযোগিতা হয়। নতুন দুটি বিদ্যালয় চালু হলে বহু শিক্ষার্থী উপকৃত হতো। কিন্তু নির্মাণকাজে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে আগামী শিক্ষাবর্ষেও ভর্তি কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
তার মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে সময়সীমা রক্ষা না হলে সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষের আস্থাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বোতলাপাড়া প্রকল্পে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রকৌশলী মাহমুদ জানান, কাজ অব্যাহত রয়েছে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালানো সম্ভব হলে প্রকল্পের অবশিষ্ট অংশ শেষ করতে অন্তত আরও ছয় মাস সময় প্রয়োজন হবে।
এ বিষয়ে রংপুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রতীশ চন্দ্র সেন বলেন, করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং কিছু কারিগরি জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, বোতলাপাড়ার বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ আগামী অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। কাজ শেষ হলে ভবন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তবে হাজীপাড়ার বিদ্যালয়ের কাজ সম্পন্ন হতে আরও প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সময় বাড়লেও প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে না। ভবন হস্তান্তরের পর শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থী ভর্তি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্পন্ন করবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষা অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হলে ইতোমধ্যে কয়েক দফা শিক্ষার্থী ভর্তি সম্পন্ন হতে পারত। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্বে সেই সুযোগ হারিয়েছে হাজারো শিক্ষার্থী। দ্রুত নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে রংপুরে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। নতুন দুটি বিদ্যালয় চালু হলে শুধু আসনসংকট কমবে না, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, ঝরে পড়া রোধ এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা, আর কোনো অজুহাত নয়—দ্রুত শেষ হোক বহু প্রতীক্ষিত এই দুই সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ। প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হলে সরকারি শিক্ষার সুযোগ পাবে হাজারো শিক্ষার্থী। কারণ প্রতিটি বিলম্বিত দিন মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে এবং দীর্ঘায়িত করছে হাজারো পরিবারের প্রতীক্ষা।


