আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সদ্য গঠিত প্রতিরক্ষা জোট। এই জোটে ইরানকে যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে—এমন খবর প্রকাশের পর আঞ্চলিক রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা।
লেবাননভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-মায়াদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট-সংশ্লিষ্ট সংবাদ সংস্থা খানে মিল্লাতের প্রধান মেহেদী রহিমি দাবি করেছেন, তেহরান এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব পেয়েছে এবং বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তবে এই দাবির সঙ্গে ইরানের সরকারি বক্তব্যের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই ২৪ আগস্ট জানান, তেহরান এখন পর্যন্ত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পায়নি। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব বা আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানান। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও ইরানকে সদস্য করার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
কী এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি?
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেন।
চুক্তির মূল বিষয় হলো সম্মিলিত প্রতিরক্ষা। অর্থাৎ তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তবে জোটের নেতারা স্পষ্ট করেছেন, এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে গঠিত সামরিক জোট নয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চুক্তিটিকে ‘সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে নীতিগতভাবে অন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্যও জোটের দরজা খোলা থাকার কথা বলা হয়েছে।
ইরান যুক্ত হলে বদলে যেতে পারে সমীকরণ
ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক এই আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে সৌদি আরবের সঙ্গে তেহরানের দীর্ঘদিনের বৈরিতার কারণে। একই প্রতিরক্ষা কাঠামোয় দুই দেশ যুক্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে তা বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
অন্যদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। ফলে তেহরানকে কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তব রূপ পেলে সেটি শুধু সামরিক সহযোগিতা নয়, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন বার্তা দিতে পারে।
তবে এখনই ইরান এই জোটে যোগ দিচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কারণ আমন্ত্রণ পাওয়ার দাবি এবং ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে বিষয়টি আপাতত সম্ভাব্য আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
জোট সম্প্রসারণের ইঙ্গিত
মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই এর সম্ভাব্য সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা চলছে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চুক্তিটি অন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্যও উন্মুক্ত থাকতে পারে, যদি তারা এর নীতিগুলো মেনে চলে এবং বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানে সম্মত থাকে।
চুক্তিতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি যৌথ প্রকল্প, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডে সমন্বয়ের বিষয়ও রয়েছে।
ফলে ইরানকে ঘিরে বর্তমান আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সদস্যপদে গড়ায় কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে এই ঘটনা এটুকু স্পষ্ট করছে—মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও আঞ্চলিক ও স্বনির্ভর করার পথে এগোচ্ছে। আর সেই প্রক্রিয়ায় ইরানের সম্ভাব্য ভূমিকা ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।


