আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও ইরানের অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং বছরের পর বছর অবরোধ মোকাবিলা করতে গিয়ে দেশটি এমন একটি বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা বহির্বিশ্বের চাপ সামলানোর সক্ষমতা তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর এক বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের অর্থনীতির সামনে সংকট কম নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাসে চলতি বছর দেশটির অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে ইরানি মুদ্রার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
তবে এসব চাপ সত্ত্বেও ইরানের রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামো এখনো কার্যকর রয়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমিত সংযোগ, বিদেশি বিনিয়োগের ঘাটতি এবং অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের বড় ভূমিকা শান্তিকালে দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হলেও সংকটের সময়ে এগুলো কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক পুঁজির ওপর নির্ভরতা কম থাকায় হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ বিদেশি পুঁজি প্রত্যাহারের ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে কম। একই সময়ে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও রিয়ালের অবমূল্যায়নের কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও পুঁজিবাজারের দিকে ঝুঁকেছেন।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরি করেছে। চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে স্থল, রেল এবং সমুদ্রভিত্তিক বিভিন্ন বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে দেশটি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব আংশিকভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে তেল রপ্তানির বিকল্প নেটওয়ার্ক দেশটির অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে অর্থনীতির এই প্রতিরোধক্ষমতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের আয় ও সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য কমিয়ে দিচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দারিদ্র্যও আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামো উন্নয়ন পিছিয়ে দেওয়া, রাষ্ট্রীয় সঞ্চয় ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ সীমিত রাখার মাধ্যমে এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। অর্থাৎ ইরান হয়তো নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা সামলাতে পেরেছে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দেশটির অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে।
ইরানের অভিজ্ঞতা তাই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। কোনো দেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলে দ্রুত রাজনৈতিকভাবে নতিস্বীকার করানোর কৌশল সব পরিস্থিতিতে একই ফল দেবে—এমন ধারণাকে ইরানের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক প্রতিরোধ নতুন করে চ্যালেঞ্জ করছে।


