আন্তর্জাতিক ডেস্ক
হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও চীনে প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮৪ জনে। একই সঙ্গে দুই দেশে নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৪৮২ জন। প্রতিকূল আবহাওয়া ও নতুন করে বন্যার আশঙ্কার মধ্যেই দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী।
নেপালের উত্তরাঞ্চলের বাগমতী প্রদেশে বুধবারের আকস্মিক বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, সেখানে এখন পর্যন্ত ৫৭৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। অন্যদিকে তিব্বতের শিগাৎসে প্রদেশের গিরং এলাকায় ভূমিধসে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
এক দিনের ব্যবধানে মৃতের সংখ্যা ৩৬২ থেকে লাফিয়ে ৫৮৪-তে পৌঁছেছে। উদ্ধারকারীরা দুর্গত বিভিন্ন এলাকা থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের পর প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
শুধু নেপালেই নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯২৪ জন। তিব্বতে নিখোঁজ ৫৫৮ জনকে যুক্ত করলে দুই দেশে নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ৪৮২ জনে। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৩০টি দেশের ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত দক্ষিণ কোরিয়ার নয় নাগরিকও এখনো নিখোঁজ।
আটকে শতাধিক, চলছে সেনাবাহিনীর অভিযান
বন্যায় নেপালের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ এলাকায় ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একটি সুড়ঙ্গে শতাধিক মানুষ আটকা পড়েছেন। কাদা ও ধ্বংসাবশেষে পুরো এলাকা ঢেকে যাওয়ায় সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই নেপালের সেনাবাহিনী উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও প্রায় ৩৫০ শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাকে সুড়ঙ্গ থেকে বের করে আনা হয়েছে। এখনো সেখানে আটকা পড়ে থাকা প্রায় ১০০ জনকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে দুর্গত এলাকায় ১৪ হাজার ৮০০-এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত তারা ৩ হাজার ৭৪২ জনকে উদ্ধার করেছেন। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১২১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। পাশাপাশি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ৩ হাজার ২৫৩ জনকে নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিদেশি সহায়তার প্রস্তাব, আপাতত প্রয়োজন নেই নেপালের
বিপর্যয়ের পর নেপালকে উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ। তবে কাঠমান্ডু জানিয়েছে, বিদেশি আর্থিক সহায়তা গ্রহণে তারা আগ্রহী হলেও এই মুহূর্তে বিদেশি উদ্ধারকারী দলের প্রয়োজন নেই।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী জানিয়েছেন, দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীই বর্তমানে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ভবিষ্যতে বিশেষায়িত দক্ষতা বা সহযোগিতার প্রয়োজন হলে বিদেশি সহায়তা চাওয়া হতে পারে।
নতুন বন্যার আশঙ্কায় উদ্বেগ
উদ্ধার অভিযান চলার মধ্যেই নতুন বিপদের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় ধ্বংসস্তূপ জমে সৃষ্ট একটি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে পানি জমে তৈরি হওয়া হ্রদ উপচে পড়েছে। এতে কয়েকটি এলাকায় দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে কিছু এলাকায় উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিতও রাখতে হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশনের নেপাল প্রতিনিধি দলের প্রধান ডেভিড ফিশারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগে অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুর্গতদের দ্রুত সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে নতুন করে বন্যার ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
হিমালয়ের এই বিপর্যয়ের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ধারণা, লাংটাং লিরুং পর্বতের প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে বিশাল একটি হিমবাহ ও পাথরের স্তর ধসে পড়ে। প্রায় ৬০০ মিটার প্রশস্ত ওই ধসের অভিঘাত ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমপর্যায়ের ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ধসের পর বরফ, পানি ও পাথরের বিশাল স্রোত লেন্দে নদী হয়ে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের ত্রিশূলী নদীর দিকে নেমে যায়। এর ফলে সৃষ্টি হয় আকস্মিক ভয়াবহ বন্যা।
বিশেষজ্ঞদের আরেকটি আশঙ্কা, হিমবাহ গলে প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে তৈরি হওয়া হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও দুর্যোগকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণতা অব্যাহত থাকলে হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা।


