১৫০ গ্যাসকূপ খনন, রামপালের ৬৬০ মেগাওয়াট ইউনিট চালু ও সৌরবিদ্যুতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা
দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে জ্বালানি সংকটমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে গ্যাসের দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এসব পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
৭ ও ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের উত্থাপিত জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের জবাবে প্রতিমন্ত্রী সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অতীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বর্তমান সংকটকে আরও জটিল করেছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার তিন ধাপে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে বন্ধ থাকা রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউনিটটি চালুর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে সংসদে জানান প্রতিমন্ত্রী।
একই সঙ্গে গ্যাসের ঘাটতি কমাতে বড় ধরনের অনুসন্ধান কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশে ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খনন করা হবে। এর মধ্যে ৩০টি কূপের খননকাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।
মধ্যমেয়াদে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য আগামী ছয় মাস শতভাগ করছাড়ের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
এ ছাড়া ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং বেসরকারি সৌর প্রকল্প থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্পের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কেনার উদ্যোগের কথাও সংসদে তুলে ধরেন তিনি।
রামপাল ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকার খালি জায়গায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মধ্যে রামপালে ৪৬০ মেগাওয়াট এবং মাতারবাড়িতে ৭০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে দেশে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়বে এবং পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারি জমিতে প্রকল্প উন্নয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) সম্প্রসারণের জন্য নতুন নীতিমালা ও নির্দেশিকা কার্যকর করা হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
বর্তমান সংকটের জন্য শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাকে দায়ী না করে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
অন্যদিকে, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংকট মোকাবিলায় উচ্চপর্যায়ের একটি যৌথ ‘জ্বালানি সেল’ বা টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধানে সরকারকে সহযোগিতা করার কথাও জানান তিনি।
সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গ্যাসকূপ খনন, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল ইউনিট চালু এবং ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এসব উদ্যোগ কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই আগামী কয়েক বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।


