বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজ
ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্তের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন রাজধানীর প্রায় ৩ হাজার টন পৌর বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আমিনবাজারে নির্মাণাধীন এ প্রকল্প থেকে ২০২৮ সালের আগস্ট নাগাদ জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
চীনের চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন—সিএমইসি গ্রুপের বিনিয়োগে আমিনবাজারে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রকল্পটির অগ্রগতি পর্যালোচনা করে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি প্রায় ২৫ বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রাখবে।
বর্জ্যই হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি
প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—ঢাকার প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ পৌর বর্জ্যকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন বর্জ্য প্ল্যান্টে সরবরাহ করা হবে।
এর ফলে একদিকে ল্যান্ডফিলে জমা হওয়া বর্জ্যের চাপ কমবে, অন্যদিকে সেই বর্জ্য থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এ ধরনের উদ্যোগ সফল হলে নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি উৎপাদনকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
শুধু বিদ্যুৎ নয়, পরিবেশ ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। রাজধানীর বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনার ওপরও এ প্রকল্পের প্রভাব পড়তে পারে।
তবে পরিবেশগত দিক থেকে প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে বর্জ্যের ধরন, দহন প্রক্রিয়া, বায়ু নিঃসরণ এবং উৎপাদিত ছাই ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। পরিবেশবাদী কয়েকটি সংগঠন ইতোমধ্যে প্রকল্পটির ব্যয়, বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কার্বন ক্রেডিটের সম্ভাবনা, তবে হিসাবই মূল বিষয়
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতির পাশাপাশি প্রকল্পটি বাংলাদেশের কার্বন অর্থনীতিতেও সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ল্যান্ডফিলে বর্জ্য পচনের ফলে তৈরি হওয়া মিথেনসহ গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানো গেলে তা নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার ব্যবস্থার আওতায় ক্রেডিট পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে প্রকল্প থেকে ঠিক কত টাকার কার্বন ক্রেডিট পাওয়া যাবে—তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। প্রকৃত নির্গমন হ্রাস কত হচ্ছে, তা পরিমাপ, রিপোর্টিং ও স্বাধীন যাচাইয়ের পরই কার্বন ক্রেডিটের পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
ঢাকার জন্য বড় পরীক্ষাও
সরকার একই সময়ে ঢাকার দক্ষিণ অংশের মাতুয়াইলেও আরেকটি বর্জ্যভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সেখানে বর্জ্য থেকে মিথেন গ্যাস উৎপাদন করে বিদ্যুৎ তৈরির পাশাপাশি জৈব সার, পশুখাদ্য ও পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ফলে আমিনবাজার ও মাতুয়াইলের প্রকল্প দুটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বর্জ্যকে বোঝা হিসেবে না দেখে সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের একটি নতুন মডেলও গড়ে উঠতে পারে।
তবে প্রকল্পের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে পর্যাপ্ত বর্জ্য সরবরাহ, আধুনিক ও নিরাপদ প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবেশগত মান বজায় রাখা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাস্তব দক্ষতার ওপর। এসব শর্ত নিশ্চিত করা গেলে ঢাকার দীর্ঘদিনের বর্জ্য সংকট মোকাবিলায় আমিনবাজার প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


