আরমান হোসেন, জয়পুরহাট প্রতিনিধি:
মাটি, খড়, বাঁশ, দড়ি আর রং—এসব সাধারণ উপকরণই স্বপন সরকারের হাতে পেলে ধীরে ধীরে পেয়ে যায় দেবীর অবয়ব। কখনো দুর্গা, কখনো কালী, লক্ষ্মী কিংবা বিশ্বকর্মা। উৎসব যত ঘনিয়ে আসে, ততই ব্যস্ত হয়ে ওঠে তাঁর কর্মশালা। দিন-রাতের হিসাব ভুলে ছয় কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে চলে প্রতিমা তৈরির কাজ।
কিন্তু এই ব্যস্ততা মাত্র তিন মাসের। বাকি নয় মাস? তখন দেবী গড়ার হাতেই ওঠে রাজমিস্ত্রির হাতুড়ি, কৃষিকাজের সরঞ্জাম কিংবা অন্য কাজের দায়িত্ব। জীবিকার তাগিদে পেশা বদলাতে হয় বারবার।
আক্কেলপুর উপজেলার কাশিড়া গ্রামের স্বপন সরকার দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিমা তৈরি করছেন। ২৩ বছর বয়সে মেসোর কাছ থেকে মাত্র এক মাসে এই কাজ শিখেছিলেন। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। এখন প্রতিমা তৈরি তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়, এক ধরনের নেশাও।
দুর্গাপূজা, কালীপূজা, লক্ষ্মীপূজা, বিশ্বকর্মা পূজা, জগদ্ধাত্রী পূজাসহ বিভিন্ন উৎসবের প্রতিমা তৈরি করেন তিনি। বছরে প্রায় ৬০টি’র বেশি প্রতিমা তৈরির সক্ষমতা রয়েছে তাঁর। এবার শুধু দুর্গারই ১২টি প্রতিমা তৈরি করছেন।
একটি প্রতিমা তৈরি করতে রংসহ সময় লাগে প্রায় পাঁচ দিন। কাজের চাপ বাড়লে রাত-দিন সমান হয়ে যায়। প্রতিমার আকার ও নকশার ওপর নির্ভর করে দামও বদলে যায়। সাধারণ বা পারিবারিক প্রতিমার দাম প্রায় ৩৫ হাজার টাকা থেকে শুরু। বড় বা নকশাদার প্রতিমার দাম ৫০ হাজার, এক লাখ কিংবা তারও বেশি হতে পারে।
দেখতে বড় অঙ্কের টাকা মনে হলেও সেই অর্থের পুরোটাই কারিগরের হাতে থাকে না। প্রতিমা তৈরিতে লাগে বাঁশ, খড়, মাটি, কাঠ, দড়ি, চট, পাট, রংসহ নানা উপকরণ। স্বপনের ভাষ্য, আগের তুলনায় এসব উপকরণের খরচ প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। তার সঙ্গে রয়েছে কর্মীদের পারিশ্রমিক।
স্বপনের সঙ্গে কাজ করা ছয়জন কর্মীর প্রত্যেককে মাসে ১৫ হাজার টাকা করে দিতে হয়। তিন মাসের মৌসুমে শুধু তাঁদের পারিশ্রমিক বাবদ খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
সব খরচ মেটানোর পর একটি প্রতিমা থেকে স্বপনের হাতে থাকে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। এবার ১২টি দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে তাঁর নিজের আয় হতে পারে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। অর্থাৎ উৎসবের মৌসুমে কর্মশালায় ব্যস্ততা যতই থাকুক, এই আয় দিয়েই সারা বছর সংসার চালানোর সুযোগ নেই।
স্বপনের সংসারে স্ত্রী, তিন ছেলে, মা ও শাশুড়িসহ ছয়জন সদস্য। তাই প্রতিমার কাজ শেষ হলেই তাঁকে ফিরে যেতে হয় অন্য কাজে। বছরের বাকি নয় মাস কখনো রাজমিস্ত্রি, কখনো কৃষিকাজ, আবার কখনো ব্যবসার কাজে যুক্ত থাকেন তিনি। রাজমিস্ত্রি ও কৃষিকাজ মিলিয়ে মাসে গড়ে প্রায় ১৫-২০ হাজার টাকা আয় করেন। জরুরী প্রয়োজনের সময় ধারও করতে হয়।
স্বপন বলেন, তিনি অন্য কাজ জানেন বলেই কোনোভাবে সংসার চালিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু যাঁদের প্রতিমা তৈরি ছাড়া অন্য কাজের অভিজ্ঞতা নেই, তাঁদের পরিস্থিতি আরও কঠিন।
এই পেশায় স্বপনের পথচলা দুই দশকের বেশি সময়ের। তাঁর স্মৃতিতে, ২০০৫–০৬ সালের দিকে সাধারণ বা মাঝারি আকারের একটি দুর্গা প্রতিমার দাম ছিল আনুমানিক ০৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এখন সেই প্রতিমার দাম অনেক বেড়েছে। কিন্তু তাঁর মতে, কাঁচামাল ও প্রতিমার বিক্রয়মূল্য যে হারে বেড়েছে, শিল্পীর নিজের প্রকৃত আয় বা লাভ সে হারে বাড়েনি।
প্রতিমার দাম বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তৈরির খরচও। বাঁশ, খড়, মাটি, রং থেকে শুরু করে শ্রমিকের পারিশ্রমিক—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। তাই প্রতিমা বিক্রি করে যে অর্থ আসে, তার বড় অংশই খরচ হয়ে যায় প্রতিমা তৈরির পেছনে। তবু এই পেশা ছাড়ার কথা ভাবেননি স্বপন।
‘এটা একটা নেশার মতো’—প্রতিমা তৈরির প্রতি নিজের টান বোঝাতে এমনটাই বলেন তিনি। এই টানটা শুধু স্বপনের মধ্যেই আটকে নেই। তাঁর তিন ছেলেও বাবার কাছ থেকে প্রতিমা তৈরির কাজ শিখেছে। তাঁরাও এই পেশায় আগ্রহী। তবে স্বপনের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা সেখানেই—বছরের নয় মাস কাজ না থাকা।
তাঁর মতে, সারা বছর যদি প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকার মতো কাজ পাওয়া যেত, তাহলে এই পেশা আরও টেকসই হতো। অন্য পেশায় ছুটতে হতো না। কিন্তু সেই সুযোগ না থাকায় প্রতিমা তৈরির মতো ঐতিহ্যবাহী কাজ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
উৎসবের কয়েক দিন আগে স্বপনের তৈরি প্রতিমা যখন মণ্ডপে পৌঁছে যায়, তখন সেই প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রার্থনা করেন, আনন্দ করেন। আলোয় ভরে ওঠে চারপাশ। কিন্তু সেই আলো তৈরি করা কারিগরের জীবনে উৎসব শেষ হলেই নেমে আসে অন্য বাস্তবতা। মাটি দিয়ে দেবীর অবয়ব গড়া হাতকে তখন খুঁজতে হয় নতুন কাজ। আবার অপেক্ষা—পরবর্তী পূজার, পরবর্তী অর্ডারের, আর কয়েক মাসের নিশ্চিত আয়ের।
স্বপনদের গল্প তাই শুধু প্রতিমা তৈরির গল্প নয়। এটি এমন এক পেশার গল্প, যেখানে সারা বছরের জীবিকা নির্ভর করে মাত্র কয়েক মাসের ব্যস্ততার ওপর। উৎসব আসে, প্রতিমা তৈরি হয়, পূজা শেষ হয়—কিন্তু কারিগরদের জীবনে থেকে যায় অনিশ্চয়তা।


