রেজাউল ইসলাম সেলিম, নিয়ামতপুর (নওগাঁ)
জন্ম ও শেকড় চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে, কিন্তু জীবনের শেষবেলায় ৮৭ বছর বয়সী কোহিনুর বেগমের ঠাঁই হয়েছে নওগাঁর নিয়ামতপুরে। বয়সের ভার, চরম দারিদ্রতা আর বিনা চিকিৎসায় রোগশোকের সাথে যুদ্ধ করতে করতে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন অশীতিপর এই বৃদ্ধা। বর্তমানে জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার বর্তমান ঠিকানা নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার হাজিনগর ইউনিয়নের উপর কুড়া শালবাড়ি গ্রামে।

জানা যায়, গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি গ্রামের মৃত কলিম উদ্দিনের মেয়ে কোহিনুরের বিয়ে হয়েছিল একই উপজেলার বিয়ানা গ্রামের কাদের মোল্লার সাথে। বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় জন্ম নেয় মেয়ে সালমা। ১২ বছর পর স্বামী হারান তিনি। এরপর নানা প্রতিক’লতায় সালমাকে বড় করে বিয়ে দেন। সালমা স্বামী সংসারে চলে গেলে এক হয়ে পড়েন তিনি। আয় রোজগারের কোন উপায় না থাকায় ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেন। বর্তমানে বার্ধক্যে সে পথও আজ বন্ধ। তাই বাধ্য হয়েই আশ্রয় নিতে হয়েছে একমাত্র মেয়ে সালমার সংসারে।
সালমার ৫ সদস্যের সংসারে স্বামী তৈয়ব আলীও দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ও কর্মক্ষমহীন। এ সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ১৮ বছর বয়সী বৃদ্ধার নাতি ও সালমার ছেলে মমিনুর। মমিনুর কৃষি শ্রমিক হওয়ায় তার আয় দিয়ে ডাল—ভাত জুটাতেই নুন আনতে পান্তা ফুরায় দশা।

পারিবারিক অসচ্ছলতা ও দারিদ্রতার চিত্র আরও করুন। নেই বসবাস উপযোগী বসতঘর। গবাদিপশুসহ পুরো পরিবার একটিমাত্র ঘরে গাদাগাদি করে থাকেন। কোহিনুর বেগম থাকেন সেই ঘরের সাথে লাগা একটি ভাঙ্গা চালার নিচে ভাঙ্গা খাটের বিছানায়। সামান্য বৃষ্টিতেই সেই ভাঙ্গা চালা দিয়ে পানি পড়ে ঘরে। তখন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আর শীতে হু হু করে ঢঁুকে পড়ে উত্তরের কনকনে হাওয়া। তখন জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে পড়ে কহিনুরের। বর্তমানে তীব্র হাঁটু ও কোমর ব্যথায় শয্যাশায়ী কোহিনুর। বিনা চিকিৎসায় ধঁুকে ধঁুকে মরছেন তিনি। এসময় তাঁর প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবারসহ নিয়মিত ঔষধপত্র ও চিকিৎসা। কিন্তু কোনটাই মিলছেনা অশীতিপর কোহিনুরের।
কোহিনুরের প্রতিবেশী সাকিম বলেন, পরিবারটি বড় অসহায়। ঋণ ও অভাবের তাড়নায় যখন ঢাকায় থাকতাম তখন কিছু টাকা—পয়সা দিয়ে বৃদ্ধাকে সাধ্যমত সাহার্য্য করেছি। কিন্তু এখন আর পারিনা। অশীতিপর বৃদ্ধার মানবেতর জীবনযাপনের কথা বলেন প্রতিবেশী ডালিম ও তাহসীনাও।
কান্নাজড়িত কন্ঠে বৃদ্ধার মেয়ে সালমা বলেন, বয়স্ক ভাতার জন্য বহু দপ্তরে ঘুরে ঘুরে অবশেষে দুই মাস আগে মিলেছে কার্ড। তবে পাননি আর কোনো সরকারি সুযোগ সুবিধা। বর্তমানে মায়ের খাবার, ঔষুধ ও থাকার সুব্যবস্থা করতে না পেরে মাকে নিয়ে তারাও চরম বিপদের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। চোখের সামনে চিকিৎসা অভাবে ‘মা’ দিন দিন মৃত্যুর দিকে চলে যাচ্ছেন এটা সহ্য করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তাই তিনি স্থানীয় প্রশাসনের নিকট তার মায়ের একটি নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাদ্য সহায়তা ও সুচিকিৎসার আকুল আবেদন জানিয়েছেন।


