পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়া যেখানে কারখানায় স্থাপন অবৈধ,সেখানে মিলেছে বিএসটিআই সনদ !
ডেস্ক রিপোর্ট:
নওগাঁয় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই মশার কয়েল উৎপাদনের অভিযোগ উঠেছে পিকে কনজ্যুমার প্রডাক্টসের বিরুদ্ধে। ‘ওসাকা’ ব্র্যান্ডের এসব কয়েল উৎপাদন করা হচ্ছে মহাদেবপুর উপজেলার দাশরা এলাকায়। তবে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) নথিতে কারখানার ঠিকানা উল্লেখ রয়েছে নওগাঁ সদর উপজেলার উত্তর লক্ষ্মীপুর। এ ছাড়া মালিকের নাম ও পণ্যের উৎপাদনের তারিখ নিয়েও একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কারখানাটির পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদন খারিজ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। অন্যদিকে বিএসটিআইয়ের নথিতে উল্লেখিত ঠিকানার সঙ্গে বাস্তবে উৎপাদনকেন্দ্রের অবস্থানের মিল পাওয়া যায়নি। বাজার থেকে সংগ্রহ করা ‘ওসাকা’ কয়েলের প্যাকেটে বিএসটিআইয়ের নথিতে উল্লেখিত নিবন্ধনের তারিখের আগের উৎপাদনের তারিখও পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি উৎপাদন চলাকালে কারখানাটিতে প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন অনুসন্ধানী দলের সদস্যরা। তবে ফটকে থাকা নিরাপত্তাকর্মী তাঁদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেননি। পরে মালিকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে অনুমতি চাওয়া হলেও তা পাওয়া যায়নি। কারখানাটির বৈধতা সম্পর্কে জানতে চাইলে মালিক দাবি করেন, তাঁদের সব কাগজপত্র ঠিক আছে।
কারখানার প্রধান ফটকের সামনে থাকা সাইনবোর্ডে বিএসটিআইসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নাজমুল হক জানান- কারখানাটির পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদন খারিজ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, কারখানাটি যথাযথ স্থানে স্থাপন না করা এবং আবেদন করার পর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আর যোগাযোগ না করায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারখানাটি যদি চলমান থাকে তাহলে অভিযান পরিচালনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার বিষয়টি সামনে আসার পর কারখানাটির বিএসটিআই অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ বিষয়ে বিএসটিআই বগুড়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক দেলোয়ার হোসেন জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকলেও পিএইচপি সনদ ঠিক থাকলে অনুমোদন দেওয়া সম্ভব।
কয়েলের প্যাকেটে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে পণ্যের বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার কথা জানান তিনি। তবে অনুসন্ধানী দলের হাতে থাকা প্যাকেটের কিউআর কোড স্ক্যান করে কৃষি অধিদপ্তরের লাইসেন্সসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়।
বিএসটিআইয়ের নথিপত্র পর্যালোচনা করে মালিকের নামেও অমিল পাওয়া গেছে। কারখানায় গিয়ে যিনি নিজেকে মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন, তাঁর নাম ফারুক আহমেদ লিটন। কিন্তু বিএসটিআইয়ের নথিতে মালিক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে রাহাত হোসেনের নাম। রাহাত হোসেনের সাথে যোগাযোগের একটি নাম্বার পাওয়া গেলেও তা বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ঠিকানা নিয়েও রয়েছে অসংগতি। বিএসটিআইয়ের নথিতে কারখানার ঠিকানা নওগাঁ সদর উপজেলার উত্তর লক্ষ্মীপুর উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে কয়েল উৎপাদন করতে দেখা গেছে মহাদেবপুর উপজেলার দাশরা এলাকায়।
এ ছাড়া বিএসটিআইয়ের নথি অনুযায়ী, কারখানাটির নিবন্ধনের তারিখ ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি। কিন্তু বাজার থেকে সংগ্রহ করা কয়েলের প্যাকেটে এর আগের উৎপাদনের তারিখ পাওয়া গেছে। ফলে নিবন্ধনের আগে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এসব অসংগতি নিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে বিএসটিআই বগুড়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক দেলোয়ার হোসেন ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি।
পরে বিএসটিআই বগুড়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক ও অফিসপ্রধান মো. জহুরুল হকের কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। নথিতে উল্লেখিত ঠিকানায় কারখানা না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
কারখানাটির পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদন খারিজ, বিএসটিআইয়ের নথিতে মালিকের নাম ও ঠিকানার অসংগতি এবং নিবন্ধনের আগের উৎপাদনের তারিখ—সব মিলিয়ে ‘ওসাকা’ কয়েলের উৎপাদন ও বাজারজাত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদন্ত ও ব্যাখ্যা প্রয়োজন।


