আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
ভারতে ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ বাড়ছে তরুণদের মধ্যে। ভোটাধিকার রক্ষা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থী ও তরুণ আন্দোলনকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় যথাযথ স্বচ্ছতা না থাকলে প্রকৃত ভোটাররাও তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা ও বিক্ষোভকারীদের আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীদের দাবি, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।
২২ বছর বয়সী অর্থনীতির শিক্ষার্থী কাশিশ রাওয়াতও ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পুলিশের ব্যারিকেড বসানো হয়েছিল। বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ বলপ্রয়োগ করে এবং কয়েকজনকে আটক করে নিয়ে যায়। এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন নিয়ে আলোচনা আরও বাড়ে।
পুলিশের বাধা সত্ত্বেও প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন কাশিশ। তাঁর মতে, ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা তাঁদের দাবি তুলে ধরবেন।
ভারতে ভোটার তালিকা পর্যালোচনা ও সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, তালিকায় একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত নাম এবং ভোট দেওয়ার যোগ্য নন এমন ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, যথাযথ যাচাই ছাড়া নাম বাদ দেওয়া হলে বৈধ ভোটাররা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাঁদের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে নাগরিকদের তথ্য যাচাই, আপত্তি জানানোর সুযোগ এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের ব্যবস্থা কার্যকর রাখা জরুরি।
আন্দোলনকারীরা এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি দাবি করেছেন। পাশাপাশি প্রধান নির্বাচন কমিশনার গনেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরুণদের একটি অংশ মনে করছেন, ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক কেবল নির্বাচনী ব্যবস্থার বিষয় নয়; এটি গণতান্ত্রিক অধিকার ও নাগরিক অংশগ্রহণের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ১৯ বছর বয়সী সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মায়া রিবেইরো জানান, ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার অধিকার প্রয়োগ করতে চান। কিন্তু তালিকা থেকে যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
২১ বছর বয়সী দর্শনের শিক্ষার্থী আরিয়ান কাজানিয়ার মতে, ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে আন্দোলনকারীদের অসন্তোষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে ভোটার তালিকা সংশোধনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিরোধী দল ও সমালোচকদের প্রশ্ন রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকলে তা নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে—এমন অভিযোগ স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, বিজেপির কয়েকজন নেতা আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্দোলনের পেছনে বিদেশি শক্তির মদদ থাকার অভিযোগও তোলা হয়েছে, যদিও এ দাবির পক্ষে যাচাই করা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেক তরুণ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁদের বক্তব্য, ভোটাধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তাঁদের একত্র করেছে। তাঁদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে হলে যোগ্য নাগরিকদের ভোটাধিকার সুরক্ষিত করা এবং নির্বাচনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে এই আন্দোলন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, জনসম্পৃক্ততা এবং ভোটার তালিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভারতের চলমান এই বিতর্কে এখন প্রধান প্রশ্ন হলো, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রত্যেক যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে এবং নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কীভাবে বজায় রাখা যাবে।


