বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজঃ
পরিত্যক্ত পাহাড়ি জমিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা, উৎপাদন বাড়াতে এগোচ্ছে নতুন প্রকল্প। রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে দেশের প্রথম জাতীয় গ্রিড-সংযুক্ত সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। সাত বছর আগে চালু হওয়া কেন্দ্রটি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৭৪ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অব্যবহৃত পাহাড়ি জমিকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা এ প্রকল্প দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বর্তমান কেন্দ্রের সম্প্রসারণসহ নতুন সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প চালু হলে জাতীয় গ্রিডে সৌরবিদ্যুতের সরবরাহ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৬২ সালে কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পর বাঁধের পাশে প্রায় ২২ একর জমি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ছিল। ওই জমির ১৯ একর এলাকায় প্রায় ১১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৯ সালে নির্মাণ করা হয় ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কাপ্তাই সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
একসময় পড়ে থাকা জমিতে এখন সারি সারি সৌর প্যানেল। সূর্যের আলো ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। এতে জমির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি প্রচলিত জ্বালানির বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুতের অবদানও বাড়ছে।
কাপ্তাই সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনায় জনবল ও পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কম। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে কেন্দ্রটি সচল রাখা যায়। আবহাওয়া প্রতিকূল হলে উৎপাদন কমতে পারে, তবে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন পরিস্থিতি মূলত সূর্যালোকের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল।
তিনি মনে করেন, পাহাড়ের অব্যবহৃত জমিতে পরিকল্পিতভাবে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, কাপ্তাইয়ের বর্তমান সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে আরও ১ মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নতুন ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে। প্রকল্পটির দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি জানান।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল, গ্যাস বা কয়লা পোড়ানোর প্রয়োজন হয় না। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে এ ধরনের প্রকল্প ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোরও সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন আবহাওয়া ও সূর্যালোকের ওপর নির্ভরশীল। তাই এ ধরনের প্রকল্পের সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংরক্ষণ, গ্রিড ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, কৃষিজমির উপযোগী সৌর প্রকল্প এবং পরিকল্পিত সৌর পার্ক স্থাপনের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত জমি নির্বাচন, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের এক-দশমাংশ অঞ্চলজুড়ে রয়েছে তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। এ অঞ্চলের উপযুক্ত ও অব্যবহৃত জমি চিহ্নিত করে পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কাপ্তাইয়ের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, পরিকল্পিতভাবে অব্যবহৃত জমি কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এখন প্রয়োজন সম্ভাবনাময় এলাকাগুলো চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য শক্তির অবদান বাড়ানো সম্ভব হবে।


