সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রকাশ্যে গুলি করে তারেক হোসেন বাপ্পি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দ্রুততম সময়ে বড় ধরনের অগ্রগতি পেয়েছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। ঘটনার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি মো. আরিফ হোসেনসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে—এমন একটি এলজি, একটি রিভলভার ও একটি পিস্তল উদ্ধার করেছে পুলিশ।
প্রকাশ্য সড়কে এমন নৃশংস হামলা, গুলিতে একজনের মৃত্যু এবং আরেকজনের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১৬ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার, রাত আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে সীতাকুণ্ড মডেল থানাধীন বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের অলিনগর তিন রাস্তার মোড়সংলগ্ন পাকা সড়কে এ ঘটনা ঘটে। নিহত তারেক হোসেন বাপ্পি ওই রাতে খাবার খেয়ে বন্ধু ইমনকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন। পথেই তাঁদের সামনে আসে সশস্ত্র হামলাকারীরা।
পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আগে থেকেই অবস্থান করা অভিযুক্তরা বাপ্পি ও তাঁর বন্ধুর মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে। এরপর তাঁদের মোটরসাইকেল থেকে টেনে নামিয়ে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে প্রধান অভিযুক্ত মো. আরিফ হোসেন বাপ্পিকে লক্ষ্য করে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করেন। অন্য অভিযুক্তরাও ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁকে আঘাত করেন।
পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে বাপ্পির সঙ্গে থাকা ইমন কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। এরপর বাপ্পিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি সড়কে লুটিয়ে পড়েন।
গুলির শব্দ শুনে বাপ্পিকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন তাপসির আলম শাওন। কিন্তু তিনিও হামলাকারীদের আক্রমণের শিকার হন। তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে শাওন গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে হামলাকারীরা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিহত বাপ্পির সঙ্গে প্রধান আসামি আরিফ হোসেন ও তাঁর সহযোগীদের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। বাপ্পি ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অভিযুক্তদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য একাধিকবার সামাজিকভাবে ও মৌখিকভাবে সতর্ক করেছিলেন বলে তদন্তে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ববিরোধের জেরে বাপ্পিকে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের পথে বাধা মনে করতেন অভিযুক্তরা। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। ঘটনার দিন অস্ত্র নিয়ে আগে থেকেই অবস্থান করে বাপ্পির মোটরসাইকেলের গতিরোধ এবং তাঁর ওপর হামলা চালানো হয় বলে পুলিশের দাবি।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তৎপরতা শুরু করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। ঘটনাস্থলের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে ঘটনার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান আসামিসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—প্রধান আসামি মো. আরিফ হোসেন, বয়স ২৯ বছর; ফখরুল ইসলাম, বয়স ৩২; আব্দুল মান্নান, বয়স ২৮; মো. ইফতেখার, বয়স ৩৫; আরিফুল ইসলাম জাবেদ, বয়স ২৫; এবং নুর আহাম্মদ রনি ওরফে রনি।
পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ও মুরাদপুরের বাসিন্দা। অভিযানে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলে উল্লেখ করা একটি এলজি, একটি রিভলভার ও একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রকাশ্যে গুলি করে বাপ্পি হত্যাকাণ্ড এবং শাওনকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় অস্ত্র উদ্ধার ও ছয়জনকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে। তবে হামলার সঙ্গে কার কী ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল, ঘটনার পেছনে আরও কেউ জড়িত কি না এবং অস্ত্রগুলোর উৎস কী—এসব বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে।
সীতাকুণ্ডের জনবহুল এলাকায় এমন সশস্ত্র হামলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা শনাক্ত এবং আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
উল্লেখ্য, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত নয়। তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ঘটনার প্রকৃত সত্য নির্ধারিত হবে।
সীতাকুণ্ডে প্রকাশ্যে গুলি করে বাপ্পি হত্যা—২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান আসামিসহ ছয়জন গ্রেপ্তার এবং তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় এখন তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতির দিকে তাকিয়ে এলাকাবাসী।


