রংপুর প্রতিনিধি
রংপুরের পীরগঞ্জে পবিত্র কোরআন শরিফ ও ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দায়ের করা মামলার মূল অভিযুক্ত সৌরভ চন্দ্র মহন্তকে (১৯) গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আজ মঙ্গলবার রাত ৩টা ১০ মিনিটে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক বেলাই গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদিকে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার জেরে সৌরভের পরিবারের সদস্যসহ তিনজনের বাড়িতে ভাঙচুর, আসবাবপত্র তছনছ ও দুটি টেলিভিশন ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া তিনটি খাসির বাচ্চা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা। রংপুর জেলা পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গ্রেপ্তার সৌরভ পীরগঞ্জ উপজেলার চককরিম কাশিমপুর গ্রামের বিশু মহন্তের ছেলে। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের দিকনির্দেশনায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সৌরভের টিকটক ও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পবিত্র কোরআন শরিফ ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর ভিডিও প্রকাশের অভিযোগ ওঠে। এ-সংক্রান্ত পোস্ট ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এর জেরে সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে পীরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চককরিম তেলিপাড়া গ্রামে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উত্তেজিত একদল লোক সৌরভের পরিবারের সদস্যদের বাড়িসহ দীনেশ চন্দ্র মহন্ত ও জগদিশ চন্দ্র মহন্তের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেন। তিনটি ঘরের টিনের বেড়া ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।
ঘরের ভেতরে ঢুকে আসবাবপত্র ও অন্যান্য মালামাল তছনছ করা হয়। এ সময় দুটি টেলিভিশন ভাঙচুরের পাশাপাশি রান্নাঘর ও ছাগল রাখার ঘরেরও ক্ষতি করা হয়। দীনেশ চন্দ্র মহন্তের অভিযোগ, তাঁর তিনটি খাসির বাচ্চাও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জগদিশ চন্দ্র মহন্ত বলেন, সন্ধ্যার পর রাস্তায় অনেক লোকজনের উপস্থিতি ছিল। কয়েকজন বাধা দিতে গেলেও তাঁদের বাধা দিতে দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষ্য, হঠাৎ ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল এসে বাড়িঘর ও রান্নাঘরে ভাঙচুর চালায়। বিদ্যুৎ না থাকায় কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অপর ক্ষতিগ্রস্ত দীনেশ চন্দ্র মহন্ত বলেন, তাঁর ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে দেওয়া হয়েছে। টেলিভিশন ও টিনের বেড়া ভাঙচুর করা হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি খাসির বাচ্চা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সৌরভ গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। প্রায় দুই মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পবিত্র কোরআন শরিফ ও আল্লাহকে নিয়ে গালিগালাজপূর্ণ পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গাজীপুরে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তিনি গ্রামের বাড়ি পীরগঞ্জে ফিরে আসেন। পরে পোস্টটি মুছে ফেলার পাশাপাশি নিজের ফেসবুক পেজও নিষ্ক্রিয় করে দেন বলে জানা গেছে। পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক জানান, দুর্গাপূজার সপ্তমীর দিন আগের পোস্টের বিষয়বস্তু কপি করে কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শর্টস ও রিঅ্যাকশন ভিডিও আকারে ছড়িয়ে দেন। এতে এলাকায় নতুন করে ক্ষোভ ও উত্তেজনা তৈরি হয়।
ওসি বলেন, সৌরভের বাবার বাড়িতে হামলার প্রস্তুতি চলছে—এমন খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করা হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হওয়ায় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পুলিশ সদস্যদের ফিরে আসতে বলা হয়। পরে সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সময় বাড়িঘরে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। তবে বাড়িঘর সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেন ওসি নাজমুল হক। তাঁর ভাষ্য, সৌরভসহ আরও দুজনের বাড়িতে তিনটি ঘর ও তিনটি রান্নাঘর রয়েছে। ঘরগুলো পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয়নি; টিনের বেড়ায় আঘাত করায় সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুটি টেলিভিশন ভাঙচুর ও অন্যান্য মালামাল এলোমেলো করার তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার খবর পেয়ে সোমবার রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রংপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক।
তিনি বলেন, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বাড়িঘর ভাঙচুর করতে পারেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো কোনো ঘটনা ঘটলেও তার আইনগত প্রতিকার রয়েছে। একইভাবে এর জেরে কারও বাড়িঘরে হামলা বা ভাঙচুর করাও আইনবিরুদ্ধ। উভয় বিষয়েই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ জানিয়েছে, ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় ২৭ অক্টোবর পীরগঞ্জ থানায় মামলা হয়েছে। থানার মামলা নম্বর ৩০। মামলায় দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ১৫৩, ১৫৩এ, ২৯৫এ ও ২৯৮ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর সৌরভকে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে বাড়িঘরে ভাঙচুরের ঘটনায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পৃথক কোনো মামলা হয়নি বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।


