বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজঃ
ফসলের ক্ষতি এড়াতে এবার কৃষকদের মোবাইল ফোনেই পৌঁছে যাবে আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাস। সরকারের কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় চালু হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় এসএমএস সেবা। এর মাধ্যমে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রার পরিবর্তন ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার বিষয়ে আগেভাগেই সতর্ক হতে পারবেন কৃষকরা।
সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে প্রতি ছয় ঘণ্টা পরপর কৃষকদের কাছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাঠানো হবে। আর দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিকবার সতর্কবার্তা পাঠানো হবে। ফলে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে চাষাবাদের পরিকল্পনা করার সুযোগ পাবেন কার্ডধারীরা।
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে শুধু আবহাওয়ার তথ্যই নয়, কৃষি উপকরণ সহায়তা, স্বল্প সুদে ঋণ, সেচ সুবিধা ও কৃষি বিমাসহ মোট ১০ ধরনের সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। আগামী চার বছরে দেশের প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষককে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থা অনেকটাই আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিবৃষ্টি, খরা, তাপপ্রবাহ কিংবা ঝড়ের কারণে প্রায়ই ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। এ অবস্থায় সময়মতো আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া গেলে কৃষকদের জন্য ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ হবে।
উদাহরণ হিসেবে, ধান কাটার মৌসুমে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে আগাম সতর্কবার্তা পেয়ে কৃষকরা দ্রুত ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি নিতে পারবেন। একইভাবে বৃষ্টির পূর্বাভাস অনুযায়ী সেচের সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে পানি ও উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব হতে পারে। ঝড়ের সতর্কতা পেলে ফসল ও কৃষি উপকরণ রক্ষায় আগাম প্রস্তুতিও নেওয়া যাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীন কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) এ সেবা বাস্তবায়ন করবে। প্রতিষ্ঠানটি স্বয়ংক্রিয় এসএমএস ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকদের কাছে আবহাওয়াসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দেবে।
এদিকে প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করে সরকারি সেবা সহজে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে দেশজুড়ে কৃষক কার্ড কর্মসূচির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কৃষকদের ব্যক্তিগত ও কৃষিসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, ব্যাংক হিসাব খোলা এবং পর্যায়ক্রমে কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে কার্ড দেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দেশের ৬৪ জেলার ৫০৩টি উপজেলার ১ হাজার ৬৮১টি কৃষি ব্লকে তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব ব্লকে ইতোমধ্যে ২২ লাখ কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ৯ লাখ কৃষকের ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে।
গত ১ অক্টোবর দেশের ৫৬ জেলার ৭৭টি উপজেলায় একযোগে কর্মসূচির কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। এ পর্যায়ে ১ লাখ ১০ হাজার ১৬৫ জন কৃষককে কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রাক-পাইলটিং কার্যক্রমে আট বিভাগের ১০ জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকে ২০ হাজার ৮৩২ জন কৃষকের মধ্যে কার্ড বিতরণ করা হয়। এ পর্যায়ে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের মধ্যে ২০ হাজার ৪৮০ জনকে জনপ্রতি বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে মোট ৫ কোটি ১২ লাখ টাকা আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মো. রাকিবুজ্জামান খান বলেন, কৃষকদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও তাদের চাহিদা নিরূপণের মাধ্যমে কৃষির আধুনিকায়নে সহায়তা দেওয়ার কাজ চলছে। নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি হলে কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির কার্যক্রম সহজ হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষক কার্ড সেলের অতিরিক্ত সচিব মো. ইয়াসীন বলেন, প্রকৃত কৃষকদের তথ্য সংরক্ষণ এবং তাদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করাই এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। এ লক্ষ্যে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, ব্যাংক হিসাব খোলা ও কার্ড বিতরণের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বলেন, কৃষকদের মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাঠানোর উদ্যোগটি সমন্বিত কৃষিসেবা ব্যবস্থায় নতুন সংযোজন। এর মাধ্যমে কৃষকরা আবহাওয়ার তথ্যের ভিত্তিতে চাষাবাদের পরিকল্পনা তৈরি এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে আগাম প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, সময়মতো আবহাওয়ার তথ্য পাওয়া গেলে সেচ, সার প্রয়োগ, ফসলের পরিচর্যা ও সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কৃষকরা যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলা, উপজেলা ও কৃষি ব্লককে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে পার্টনার (PARTNER) প্রকল্প। এর মাধ্যমে কৃষকদের জন্য সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা এবং আধুনিক কৃষিসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


