বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজঃ
সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন উপকূলীয় জলসীমায় জলদস্যুদের তৎপরতা কমাতে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযান, নিয়মিত টহল এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারির ফলে উপকূলীয় এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এতে স্বস্তি ফিরছে জেলে, মৌয়াল ও বনজীবীদের মধ্যে।
জলদস্যুদের দমন এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, বিজিবি ও বন বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পাশাপাশি অপহৃত ব্যক্তিদের উদ্ধার, অবৈধ অস্ত্র জব্দ এবং দস্যুদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সুন্দরবনের নিরাপত্তা ও জেলেদের সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বন বিভাগ যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করছে। এ লক্ষ্যে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বাসসকে জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৩৯ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে। অভিযানে ৪২টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ, ওয়াকিটকি, দূরবীক্ষণ যন্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৪১ জন জিম্মিকে।
তিনি আরও জানান, চলতি বছর ছয়টি জলদস্যু বাহিনীর ৫১ সদস্য কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। গত ৩০ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া পাঁচ মাসব্যাপী শুঁটকি মৌসুমে দুবলার চর, আলোরকোল ও কটকাসহ আশপাশের এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জলদস্যুদের হুমকির মুখে পড়লে জেলে ও ব্যবসায়ীদের ১৬১১১ নম্বরে কোস্টগার্ডের জরুরি হটলাইনে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, এসআরবি-৬-এর কমান্ডার নিস্তার আহমেদ জানান, ছয়টি জলদস্যু বাহিনীর ৭৪ সদস্য তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
খুলনা বিভাগীয় বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, জেলে ও বনজীবীদের নিরাপত্তার স্বার্থে গভীর সমুদ্র কিংবা বনের দুর্গম এলাকায় একা চলাচল না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রাতে ১৫ থেকে ২০টি নৌকার দলবদ্ধ বহর নিয়ে চলাচলে উৎসাহিত করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে বন বিভাগের সদস্যদেরও মোতায়েন রাখা হবে।
উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে আধুনিক টহল জাহাজ, স্পিডবোট, রাডার, জিপিএস ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। কক্সবাজার, মহেশখালী ও কুতুবদিয়াসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অপহৃত ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত এবং মুক্তিপণের লেনদেনের সূত্র অনুসন্ধানে ড্রোন প্রযুক্তি ও আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণও সহায়তা করছে।
তবে নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতি হলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি জলদস্যুদের তৎপরতা। গত ১২ অক্টোবর সুন্দরবনের শিবসা নদীর আরবনিয়া খাল এলাকায় সম্রাট বাহিনীর অপহৃত চার জেলেকে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড। এ ঘটনা উপকূলীয় এলাকায় নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে এনেছে।
নিরাপত্তার পাশাপাশি জেলেদের জীবিকা সুরক্ষায়ও সহায়তা দিচ্ছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তিন মাসের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞাকালে নিবন্ধিত জেলেদের জন্য ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী গ্রামের জেলে শাহাবুদ্দিন ব্যাপারী বলেন, সরকারি এ সহায়তা তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করেছে। এতে মাছ ধরতে না পারার সময়ে পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কিছুটা কমেছে।
শরণখোলা উপজেলার বনজীবী রমজান আলী জানান, আগে জলদস্যুদের ভয়ে তাদের বনে যেতে হতো। গত মৌসুমে তার দলের কয়েকজন সদস্য অপহরণের শিকার হন। পরে প্রত্যেকের মুক্তির জন্য ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দিতে হয়েছে।
দক্ষিণ বেদকাশীর জেলে জব্বার মোল্লা জানান, গত ৩০ অক্টোবর ৪০টি মাছ ধরার নৌকার একটি বহর দুবলার চরে পৌঁছেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলমান নিরাপত্তাব্যবস্থা জেলেদের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিমরাড) মহাপরিচালক কমডোর (অব.) সৈয়দ মেসবাহ উদ্দিন আহমদ সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও উপকূলীয় সম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, জলদস্যুতা কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকি নয়; এর প্রভাব পড়ে উপকূলীয় অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, পর্যটন এবং বন সংরক্ষণের ওপরও।
তার মতে, উপকূলে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, তথ্যদাতাদের সুরক্ষা, সহজ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


