সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা
পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে এবং এলাকার মানুষের মাঝে পারস্পরিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এক ব্যতিক্রমধর্মী ঈদ পূর্ণমিলনী ফুটবল খেলা। আনন্দ, উৎসাহ, প্রতিযোগিতা এবং সম্প্রীতির এক মিলনমেলায় পরিণত হওয়া এ খেলাকে ঘিরে স্থানীয়দের মাঝে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।
আজ বিকাল ৪টা থেকে ঐতিহ্যবাহী কুমিরা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ মাঠে এই জমজমাট ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। খেলাটি শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল না, বরং এটি ছিল দীর্ঘদিন পর একে অপরের সঙ্গে দেখা হওয়া বন্ধু, বড় ভাই, ছোট ভাই, আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি এবং সম্পর্ক আরও গভীর করার একটি অনন্য উদ্যোগ।
খেলায় অংশগ্রহণকারীদের দুইটি দলে বিভক্ত করা হয়—বিবাহিত বনাম অবিবাহিত। এই ব্যতিক্রমী আয়োজন ঘিরে শুরু থেকেই দর্শকদের মাঝে ছিল আলাদা আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস। মাঠের চারপাশে বিভিন্ন বয়সী শত শত দর্শকের উপস্থিতি খেলাটিকে উৎসবমুখর পরিবেশে রূপ দেয়। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণরাও খেলাটি উপভোগ করতে মাঠে ভিড় জমান।
খেলার শুরু থেকেই বিবাহিত দল নিজেদের অভিজ্ঞতার প্রমাণ দিয়ে আক্রমণাত্মক খেলায় এগিয়ে থাকে। টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে প্রথমার্ধে তারা ২-০ গোলে এগিয়ে থেকে প্রথময়ার্ধ শেষ করে। মাঠে উপস্থিত অনেকেই তখন ধারণা করেছিলেন ম্যাচটি হয়তো বিবাহিত দলের দখলেই চলে যাবে।
কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে যেন বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে অবিবাহিত দল। একের পর এক আক্রমণের মাধ্যমে তারা দুই গোল পরিশোধ করে খেলায় সমতা ফিরিয়ে আনে। পুরো এক ঘণ্টার খেলাজুড়ে উভয় দলের আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে মাঠে সৃষ্টি হয় চরম উত্তেজনা। প্রতিটি মুহূর্তে দর্শকদের করতালি, উল্লাস ও উৎসাহ খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করে।
নির্ধারিত সময় শেষে ম্যাচের ফলাফল দাঁড়ায় ২-২ গোলে সমতা। পরে খেলা গড়ায় শ্বাসরুদ্ধকর ট্রাইব্রেকারে। সেখানে স্নায়ুচাপ সামলে দুর্দান্ত নৈপুণ্য প্রদর্শন করে অবিবাহিত দল জয়লাভ করে। তবে জয়-পরাজয়ের বাইরে গিয়ে খেলাটি পরিণত হয় আনন্দ, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার এক মিলনমেলায়।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় যা এই আয়োজনকে করেছে ব্যতিক্রমী
স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে সমাজে মানুষ ক্রমশ ব্যস্ত হয়ে পড়ছে নিজ নিজ কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত নানা ব্যস্ততায়। ফলে আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব ও প্রতিবেশী সম্পর্কের জায়গাগুলো আগের মতো দৃঢ় থাকছে না। সেই জায়গা থেকে ঈদ পূর্ণমিলনী ফুটবল খেলার মতো আয়োজন মানুষের মধ্যে আবারও ভ্রাতৃত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌজন্যবোধ এবং সামাজিক ঐক্য গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আয়োজ রানা খান জানান, এই খেলার মূল উদ্দেশ্য ছিল—
ঈদের আনন্দ সবাই মিলে ভাগাভাগি করা । এলাকার তরুণদের খেলাধুলামুখী ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা
মাদক, অপরাধ ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে যুবসমাজকে দূরে রাখা । বড়-ছোট সবার মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা । দীর্ঘদিন পর প্রবাসী ও স্থানীয়দের একত্রিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা । সামাজিক সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা । স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, এমন আয়োজন শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি সামাজিক বার্তা বহন করে। খেলাধুলা মানুষের মধ্যে বিভেদ নয়, বরং ঐক্য সৃষ্টি করে। মাঠে সবাই প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও খেলা শেষে সবাই একে অপরের বন্ধু—এটাই এমন আয়োজনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
খেলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো মাঠ ছিল দর্শকপূর্ণ। উভয় দলের খেলোয়াড়দের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ, দর্শকদের উচ্ছ্বাস এবং আনন্দঘন পরিবেশে ঈদ পূর্ণমিলনী ফুটবল ম্যাচটি পরিণত হয় স্মরণীয় এক আয়োজনে। স্থানীয়রা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এমন আয়োজনের দাবি জানান, যাতে এলাকার মানুষ আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে পারে এবং সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।


