সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা আবাসিক বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, হিসাব সংরক্ষণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একটি বেসরকারি অডিট প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির আয়-ব্যয়, ব্যাংক লেনদেন, সরকারি অর্থ, বিল-ভাউচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় একাধিক অসঙ্গতির তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রায় অর্ধকোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ।
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদভিত্তিক মাহামুদ সবুজ অ্যান্ড কোম্পানি নামের একটি অডিট ফার্মের প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন আর্থিক নথি পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আয়-ব্যয়, ব্যাংক হিসাব, সরকারি উপবৃত্তির অর্থ, বিল-ভাউচার, রেজল্যুশন ও হিসাব সংরক্ষণে একাধিক গুরুতর অসঙ্গতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক ফি সূচি অনুযায়ী আয়-ব্যয়ের হিসাবে প্রায় ৪৬ লাখ টাকার ঘাটতি পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ অর্থের সুনির্দিষ্ট হিসাব ও ব্যয়ের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ‘ঋণ বিতরণ’ খাতে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৬৩ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে এ ধরনের ঋণ বিতরণের কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুরোনো পরীক্ষার খাতা, বাতিল কাগজপত্র ও অন্যান্য উপকরণ বিক্রি করে পাওয়া অর্থ প্রতিষ্ঠানের আয় তহবিলে জমা না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অডিটে আরও উল্লেখ করা হয়, অধিকাংশ বিল-ভাউচারে নম্বর, অনুমোদিত স্বাক্ষর কিংবা যথাযথ প্রমাণপত্র পাওয়া যায়নি। এমনকি কলেজ বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক খোরশেদ আলমের স্বাক্ষরযুক্ত সাদা কাগজ ব্যবহার করে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, অগ্রণী ব্যাংক, সীতাকুণ্ড শাখা থেকে ২০২৩ সালে সরকারি পিবিজিএসআই (PBGSI) প্রকল্পের ৫ লাখ টাকা একক স্বাক্ষরে উত্তোলনের অভিযোগ করা হয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থ উত্তোলনের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও তা কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রয়োজনীয় হিসাব জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
শুধু আর্থিক বিষয় নয়, প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২০ বছর ধরে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রেখেই প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে হাঁস-মুরগি পালনসহ আরও কিছু প্রশাসনিক অসঙ্গতির বিষয়ও অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘আমাকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে অডিট করা হয়েছে’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিরা আবাসিক বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, “আমাকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এই অডিট করা হয়েছে। আমি প্রতিষ্ঠানের কোনো অর্থ সরাসরি লেনদেন করি না। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়।”
তদন্তে সত্যতা মিললে ব্যবস্থা: ইউএনও প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইসমত আরা বেগম বলেন, তাকে এ বিষয়ে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত করেনি। আর্থিক অনিয়ম তদন্ত করার এখতিয়ারও তার নেই।
তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয় শিক্ষা অফিসকে অবহিত করা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, অডিট প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।


