সীতাকুণ্ড(চট্টগ্রাম)প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একের পর এক উদ্বেগজনক ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। বাড়বকুণ্ডের অলিনগরে দুর্বৃত্তদের হামলায় যুবদল কর্মী তারেক হোসেন বাপ্পি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তাঁর বন্ধু তাফসির আলম শাওন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। অন্যদিকে, উপজেলার বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চার থেকে পাঁচ দিন আগে মারা যাওয়া এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ।
একই সময়ে উপজেলার দুটি পৃথক ঘটনায় একজনের প্রাণহানি, আরেকজনের আহত হওয়া এবং অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। কী কারণে বাপ্পিকে হত্যা করা হলো, কারা এই হামলার সঙ্গে জড়িত এবং পুকুরে পাওয়া ব্যক্তির পরিচয় কী—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
প্রথমেই আসা যাক বাড়বকুণ্ডের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়।
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, রাত সাড়ে ১০টার দিকে সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের অলিনগরে যুবদল নেতা এস এম সাদ্দাম হোসেনের পুরোনো কার্যালয়ের সামনে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
নিহত তারেক হোসেন বাপ্পির বয়স ২৬ বছর। তিনি উপজেলার মধ্যম মাহদাবাদ মিয়াজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তাঁর বন্ধু তাফসির আলম শাওনের বয়স ২২ বছর। তাঁর বাড়ি বাড়বকুণ্ডের অলিনগর এলাকায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর একদল দুর্বৃত্ত তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও গুলিতে দুজনই গুরুতর আহত হন। পরে তাঁদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তারেক হোসেন বাপ্পিকে মৃত ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে, গুলিবিদ্ধ শাওনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে অস্ত্রোপচার করে তাঁর শরীর থেকে গুলি বের করা হয়। বর্তমানে তিনি বিপদমুক্ত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
হামলার পেছনে কারা, কেনই বা এই হত্যাকাণ্ড—উঠছে নানা প্রশ্ন।
বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস এম সাদ্দাম হোসেন দাবি করেন, ঘটনার আগে ওই এলাকায় উত্তেজনা চলছিল। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় স্থানীয়দের সতর্ক করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
সাদ্দামের অভিযোগ, দলের একটি অংশের লোকজন এ হামলার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তবে তাঁর এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হামলার প্রকৃত কারণ এবং কারা এতে অংশ নিয়েছিল, তা তদন্তসাপেক্ষ।
নিহত বাপ্পির পরিবারের দাবি, তাঁর সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল না। বাপ্পির মা জামিলা খাতুন জানান, স্বামীকে হারানোর পর অনেক কষ্টে সন্তানদের বড় করেছেন তিনি। ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন জীবিকার আশায়। সেখানে সুবিধা করতে না পেরে তিন বছর কারাভোগের পর দেশে ফিরে আসেন বাপ্পি। পরে সাদ্দাম হোসেনের বালু উত্তোলন ও বিক্রির কাজে যুক্ত হন। প্রতিদিনের এক হাজার টাকা আয় দিয়েই চলত তাঁদের সংসার।
ছেলেকে হারিয়ে শোকাহত মা হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেছেন।
এদিকে, সীতাকুণ্ডের বারৈয়াঢালায় পুকুর থেকে উদ্ধার হয়েছে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ।
শনিবার বিকেল পাঁচটার দিকে উপজেলার বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের একটি পুকুরে মরদেহটি ভাসতে দেখেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ওই ব্যক্তি চার থেকে পাঁচ দিন আগে মারা গেছেন। তবে তাঁর পরিচয়, মৃত্যুর সঠিক সময় এবং কীভাবে মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে চলছে তদন্ত।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহিনুল ইসলাম জানান, যুবদল কর্মী নিহত হওয়ার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় ইফতেখার ও জাবেদ নামে দুজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়বকুণ্ড ও আশপাশের এলাকায় বালু উত্তোলন, বেড়িবাঁধসংলগ্ন গ্যাস কোম্পানির এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, উপকূলীয় জমি কেনাবেচা ও দখলসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একাধিক পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। তবে এসব বিরোধের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়।
একদিকে যুবক খুন, অন্যদিকে পুকুরে অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ—দুটি ঘটনায় সীতাকুণ্ডজুড়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।
এখন স্থানীয়দের প্রধান দাবি, তারেক হোসেন বাপ্পি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং বারৈয়াঢালায় উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করে মৃত্যুর রহস্য উন্মোচন।
সীতাকুণ্ডে এসব ঘটনার প্রকৃত রহস্য কী, তদন্তে কী তথ্য বেরিয়ে আসে—এখন সেদিকেই নজর সবার।


