চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা
দর্শনা চুয়াডাঙ্গা জেলার ভারত সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। দেশের প্রথম রেললাইন ও এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম কেরু এন্ড কোম্পানি চিনি কল কারখানা এখানে অবস্থিত, যা বৃটিশ আমলে দর্শনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি এই অঞ্চলের একটি উৎকৃষ্ট পিকনিক স্পট যেখানে একটি দোতলা ভবন বিশিষ্ট মনোরম গেস্ট হাউজ রয়েছে। দর্শনার জয়নগর নামক স্থানে স্থল বন্দর নির্মান কাজ প্রক্রিয়াধীন। এই বর্ডার ব্যবহার করে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করে। করোনার কারণে প্রায় ৩ বছর বন্ধ ছিল দর্শনা-গেদে বন্দরের ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট। দুই দেশের মানুষের দাবির কারণে ২০২৩ সালের ২ মার্চ থেকে আবার চালু হয় চেকপোস্টটি।
পরবর্তীতে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে ভারত সরকার বিধিনিষেধ আরোপ করায় কমেছে দুই দেশের মধ্যে যাত্রী পারাপার। ভিসা কেন্দ্র গুলো এখন কেবল জরুরি মেডিকেল ও স্টুডেন্ট ভিসার জন্য সীমিত পরিসরে স্লট দিচ্ছে। তাতে পর্যটন বা বিভিন্ন কাজে যারা ভারতে যাতায়াত করতেন, তারা যেতে পারছে না। আগে প্রতিদিন গড়ে যেখানে দেড় থেকে ২ হাজার যাত্রী পারাপার হতো,এখন সেখানে প্রতিদিন পারাপার হচ্ছে গড়ে ১০০ থেকে ১২০ জন যাত্রী এসে দাঁড়িয়েছে।পারাপার কমে যাওয়ায় ‘ভ্রমণ কর’ বাবদ রাজস্ব আদায়ও কমে হচ্ছে। ভিসা বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন অসংখ্য মানুষ, তবে ভারতের নাগরিকরা আগে যে ভাবে বাংলাদেশে আসতো এখনও তারা সে ভাবেই আসছে শুধু মাত্র বাংলাদেশের মানুষের মেডিকেল ভিসা ছাড়া আর কোন ভিসা দিচ্ছে না। ১ বছর ৯ মাস ৬ ধরে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা কারণে ট্যুরিস্ট ভিসা কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, কিছুদিনের মধ্যেই ভিসার আবেদন গ্রহণ শুরু হবে এবং দুই-তিন দিনের মধ্যেই ভিসা প্রদান কার্যক্রমও পুনরায় চালু হতে পারে বলে জানিয়েছেন।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে,দর্শনা সীমান্তে জিরো পয়েণ্ট থেকে ১০০ গজের মধ্যে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস চেকপোষ্টের স্থায়ী অবকাঠামো রয়েছে। বর্তমান গড়ে প্রতিদিন ২০০ যাত্রীভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যাতায়াত করে থাকে। ভারত সীমান্ত এলাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। এখানে কোন আবাসন সুবিধা নেই বিধায় দিনের আলোয় নিজ স্থানে ফিরে আসতে হবে।দর্শনা- ইমিগ্রেশনে বর্তমান তেমন ভীড় নেই, কয়েক মিনিটে সব কাজ শেষ করে ভারতের গেদে ইমিগ্রেশনের দিকে রওনা দিতে পারবেন। দর্শনা বর্ডার থেকে ১ কিলোমিটারের কম পথ গেদে ইমিগ্রেশন। ভ্যানে বা পায়ে হেটে যাওয়া সম্ভব। এক পাশে রেলপথ অন্য পাশে সবুজ ফসলের মাঠ। গেদে ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে অল্প সময়ে কাজ শেষ করে কিছু সময় অপেক্ষার পর ট্রেন ধরে তিন ঘন্টার কম সময়ে কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছে যায়। খুব অল্প খরচে এই পথ ব্যবহার করে যাতায়াত করে থাকে ঝিনাইদহ, বৃহত্তর কুষ্টিয়া এবং রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মানুষ পশ্চিমবঙ্গে যাতায়াতে সাধারণ এই বন্দরটি ব্যবহার করে। ইমিগ্রেশনে ভোগান্তি ছাড়া কম খরচে কলকাতা যাতায়াতে এই পথটি বেশ সুবিধাজনক। গেদের ইমিগ্রেশনের সাথেই রেল স্টেশন। ফলে একটা বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়। তবে, দর্শনা শহর থেকে বর্ডার এবং বর্ডার থেকে গেদে ইমিগ্রেশন যাওয়া পথে ভাড়া সরকারি ভাবে নির্ধারণ করে দিলে খরচ আরো কম হবে। যাত্রীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে দুই দেশের ইমিগ্রেশন পয়েন্টে আরো সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। গেদে, পশ্চিম বঙ্গের নদীয়া জেলার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ট্রানজিট পয়েন্ট ও চেকপোস্ট। ১৮৬২ সালে এখানে রেল স্টেশন নির্মিত হয়। শিয়ালদহ-গেদে রেল পথ ব্যবহার করে দুই দেশের মানুষ কলকাতা সহ পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করে। দেশ ভাগের আগে কলকাতা থেকে গেদে-দর্শনা রেলপথ ব্যবহার করে সরাসরি গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করতো। দীর্ঘ সময় পরে ২০০৮ সাল থেকে দুই দেশের মধ্যে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু হয়।
দর্শনা পৌর বিএনপি’র সমন্বয়ক, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজ সেবক মাহবুব-উল ইসলাম খোকন বলেন, দর্শনা-গেদে) এবং পাশের উপজেলা জীবননগরের দৌলতগঞ্জ- মাইজদিয়া’য় পূর্ণাঙ্গ স্থল বন্দর নির্মান প্রক্রিয়াধীন। ভিসা ফ্রি যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হলে বানিজ্য ও পর্যটন শিল্পের আরো বিকাশ ঘটবে। দেশের পর্যেটন স্পটগুলোতে বিদেশিদের আগমন বৃদ্ধি পাবে এতে অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হওয়া যাবে।
দর্শনা রেল বাজার ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বৃটিশ আমলে এই অঞ্চলের উৎপাদিত সবজি ট্রেনে করে কলকাতা বাজারে সরবরাহ করা হতো। ফলে, এই দুই বন্দর ব্যবসা বানিজ্যের উন্নয়নে সাথে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও সংস্কৃতি বিনিময়ে কাজ করবে। এখানে অবকাঠামো উন্নয়ন করে ক্ষুদ্র থেকে ভারি শিল্প কারখানা তৈরি করতে হবে। দুই দেশের বানিজ্য ঘাটতি কমাতে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
দর্শনা ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের উপ-পরিদর্শক তুহিন জানান, স্বাভাবিক সময়ে জয়নগর চেকপোস্ট দিয়ে প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে ২ হাজার যাত্রী ভারতে যেত। এখন সেটা কমে গড়ে ১০০-১৫০ জনে এসে দাঁড়িয়েছে । ভিসা বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন অসংখ্য মানুষ।


