শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি:
একসময় হাঁড়ি-পাতিলের চাহিদা কমে মৃতপ্রায় হয়ে পড়া মৃৎশিল্প আজ নতুন প্রাণ পেয়েছে বগুড়ার দইয়ের কল্যাণে। ২০২৩ সালে জিআই স্বীকৃতি পাওয়া এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্নের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মাটির পাত্রের চাহিদা। শেরপুরের চন্ডিযান গ্রামের কারিগররা এখন ব্যস্ত দইয়ের কাপ-সরা বানাতে, যা তাদের শতাব্দী প্রাচীন পেশায় ফিরিয়ে এনেছে কর্মচাঞ্চল্য। বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ডেলিভারি সার্ভিসের সুবাদে এ দই সারা দেশে এমনকি বিদেশেও সহজে পৌঁছে যাচ্ছে।
এই জনপ্রিয়তার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় মৃৎশিল্পের ওপর। একসময় হাঁড়ি-পাতিলের চাহিদা কমে যাওয়ায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়া এ শিল্প এখন দইয়ের সরা, কাপ ও খুঁটি তৈরির মাধ্যমে নতুন জীবন পেয়েছে। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়ীদহ ইউনিয়নের চন্ডিযান গ্রামের কারিগররা জানান, দইয়ের চাহিদা বৃদ্ধিতে তাদের শতাব্দী প্রাচীন এ শিল্পে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য ও আয়ের নতুন দুয়ার।
কারিগরদের মতে, ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের পূর্বপুরুষরা এ পেশায় যুক্ত। দইয়ের পাত্র তৈরিতে প্রথমে আঠালো লাল মাটি সংগ্রহ করে মেশিনে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। তারপর দক্ষ হাতে মেশিনে গড়ে তোলা হয় কাপ, সরা ও খুঁটি। দইয়ের গুণগত মান বজায় রাখতে বিশেষ প্রলেপ দেওয়া হয় এবং চুলায় দুই দিন পোড়ানোর পর পাত্রগুলো প্রস্তুত হয়।
ঘণ্টায় প্রায় ১ হাজার কাপ তৈরি সম্ভব এবং প্রতি হাজারে মজুরি মেলে ৭০০ টাকা। দৈনিক আয় দাঁড়ায় ৭০০-৮০০ টাকা। আগে চাকায় হাঁড়ি-পাতিল বানালেও এখন দইয়ের পাত্রই তাদের প্রধান জীবিকা। পেশাটিতে একসময় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বেশি যুক্ত থাকলেও এখন মুসলিম নারী-পুরুষও সমানভাবে কাজ করছেন। পরিবারের সন্তানরা পড়াশোনার পাশাপাশি অবসরে কাজে সহায়তা করে বাড়তি আয় করছেন।
ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ জানান, ১ কেজি মাটির পাত্র ১১ টাকায় কিনে ১৫ টাকায় বিক্রি করেন। দইয়ের কাপ ২ টাকা, খুঁটি ৫ টাকা এবং সরা ১৫-২০ টাকায় বিক্রি হয়। সবচেয়ে বেশি চাহিদা বগুড়ায়, তবে রংপুর, দিনাজপুর, ঢাকা, কক্সবাজার ও বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। প্রতি সপ্তাহে ট্রাকে ২০-৩০ হাজার পাত্র লোড হয়।
কারিগর রতন পাল বলেন, “পাকিস্তান আমলে হাঁড়ি-পাতিলের চাহিদা কমে কষ্টে দিন কেটেছে। এখন দইয়ের চাহিদায় শিল্পটি নতুন প্রাণ পেয়েছে। আয় দিয়ে সংসার চলছে, সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারছি।”
ববিতা রানি পাল বলেন, “নারীরাও পুরুষদের পাশাপাশি কাজ করি। আয় ভালো, পরিবার ভালোভাবে চলছে।”
স্কুলছাত্র মিথুন পাল বলেন, “পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করি, পরিবারকে সাহায্য করি। দইয়ের চাহিদায় পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ফিরে এসেছে।”
সাইফুল ইসলাম বলেন, “এখন মুসলমানরাও যুক্ত হয়েছি। প্রতিদিন ৭০০-৮০০ টাকা আয় হয়, দইয়ের চাহিদাই এর মূল কারণ।”
তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কারিগর ও ব্যবসায়ীরা জানান, পুঁজির অভাবে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়, যা লাভ কমিয়ে দেয়। সরকারি সহায়তা পেলে এ শিল্প আরও এগিয়ে যাবে বলে তারা আশাবাদী।


