শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি :
রক্তের প্রয়োজনে রক্ত, পানির প্রয়োজনে টিউবওয়েল, শীতের রাতে কম্বল মানুষের প্রয়োজন বুঝেই এগিয়ে চলে এই মাদ্রাসার মানবিক পথচলা।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ব্র্যাক বটতলা বাজার এলাকায় নূরে মদিনা কওমি মাদ্রাসা নীরবে লিখে চলেছে মানবিকতার গল্প। এই মাদ্রাসা শুধু শিক্ষাদানের জন্য নয়, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক বিশ্বাসযোগ্য আশ্রয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ও স্বেচ্ছাসেবী হান্নান হোসেন সাগরের হাত ধরেই মানবসেবার এই পথচলা শুরু।
মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে স্বেচ্ছাশ্রমের এক মানবিক পরিসর। এতিম ও অসহায় শিশুদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছেন সমাজের সচ্ছল বহু মানুষ। সেই সহায়তার আলো পৌঁছে যাচ্ছে আশপাশের নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ঘরেও। কেউ পাচ্ছে ফ্রি চিকিৎসা কারও পানির নিশ্চয়তা, শীতের কম্বল, আবার অনেকেই পাচ্ছেন নানা মানবিক সহায়তা।
রমজান মাস জুরেই চলে অসহায় মানুষের জন্য ছোট পরিসরে ইফতারের আয়জন। ঈদ এলেই বাড়ে ব্যস্ততা। অসচ্ছল পরিবারের জন্য প্রস্তুত করা হয় লাচ্ছা সেমাই। সচেতন রক্তদান কার্যক্রমে স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে ৮০০-এর বেশি রক্তের ব্যাগ। অনেক অসুস্থ মানুষের জীবনে এই রক্ত ফিরিয়ে দিয়েছে বেঁচে থাকার আশা।
মাদ্রাসার আব্দুল হান্নান ছাত্রদের এখানে শুধু কিতাবি জ্ঞান শিক্ষা দিচ্ছেন না, বরং বাস্তব জীবনে মানুষের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করে মানবতার শিক্ষা নিচ্ছেন।
দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোও এই তাদের নিয়মিত কাজ। বন্যার সময় মাদ্রাসার পরিচালক ও ছাত্ররা একসঙ্গে ছুটে যান দুর্গত এলাকায়, হাতে ত্রাণসামগ্রী। প্রতিমাসে আয়োজন করা হয় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প। এতে মাদ্রাসার ছাত্রদের পাশাপাশি আশপাশের দরিদ্র মানুষও চিকিৎসাসেবা পান।
মানবিক সহায়তা এখানে কাগজে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের থেকে সহায়তা পাওয়া সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়েছে অসচ্ছল নারীদের হাতে, যাতে তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন। শীতে বিতরণ করা হয়েছে কম্বল। বিশুদ্ধ পানির সংকট দূর করতে স্থাপন করা হয়েছে প্রায় ২০টি টিউবওয়েল যা চলমান। ধর্মের সীমা পেরিয়ে এক হিন্দু পরিবারদেরও সহায়তা দেওয়া হয়েছে। মানসিক ভারসাম্যহীন এক দরিদ্র নারীর জন্য ঘর নির্মাণের প্রস্তুতিও চলছে।
সমাজের সচ্ছল মানুষের কল্যানে এ পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ২০টি টিউবওয়েল, ৩৫টি কম্বল ও ১০টি সেলাই মেশিন।
সেলাই মেশিন পেয়ে আমিনা বলেন, এখন কাজ করে সংসারের খরচ জোগাতে পারছি।
এক যুগ পর টিউবওয়েলের পানি পেয়ে সুফিয়া বলেন, এই পানি আমাদের জীবনে অনেক শান্তি এনেছে। এখন আর পানির জন্য কষ্ট করতে হয় না।
শীতের রাতে কম্বল পেয়ে শতবর্ষী খুকীর মুখে ছিল প্রশান্তির হাসি।
বিনামুল্যা রক্ত পেয়ে সুস্থ হওয়া রোগী খোকন বলেন, এই রক্তই আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে।
মাদ্রাসার পরিচালক ও মানবিক স্বেচ্ছাসেবক আব্দুল হান্নান বলেন, ছাত্রদের মানবিক কাজে যুক্ত করার উদ্দেশ্য হলো তাদের ভেতরে মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলা।
মানবিকতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎও ভাবা হচ্ছে। বিনামূল্যে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গার্মেন্টস অপারেটিং, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, ইলেকট্রিশিয়ান ও স্যানিটারি টেকনিশিয়ান প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
নূরে মদিনা কওমি মাদ্রাসা ও আব্দুল হান্নান প্রমাণ করছে, মানবিকতা যখন শিক্ষার সঙ্গে হাত মেলায়, তখন একটি প্রতিষ্ঠানই হয়ে ওঠে সমাজ বদলের শক্তিশালী হাতিয়ার।


