শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ
বগুড়ার শেরপুর শহর ও আশপাশের এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও থ্রি-হুইলারের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। এসব যানবাহনের অধিকাংশ চালকের প্রশিক্ষণ নেই। অনেকের লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও নেই। এর মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্কদেরও অটোরিকশা চালাতে দেখা যায়। মহাসড়কে দ্রুতগতির বাস-ট্রাকের সঙ্গে এসব ধীরগতির যান চলাচল এবং উল্টো পথে সড়ক পারাপারের কারণে বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
সম্প্রতি শেরপুর শহরের ধুনট মোড়, বাসস্ট্যান্ড, উপজেলা মোড় ও কলেজ রোড এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের ওপর দিয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। এছারাও পাশের ধুনট, সাজাহানপুর, নন্দিগ্রাম, রায়গঞ্জ, থেকেও প্রায় ৫০০ এর অধিক অটোরিকশা চলায় যানজট চরমে। শহরের ধুনট মোড় ও উপজেলা মোড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউটার্নে কিছু অটোরিকশাকে উল্টো পথে এসে মহাসড়ক পার হতে দেখা যায়। এ সময় দ্রুতগতির বাস ও ট্রাক চলাচল করায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
ধুনট মোড় ও উপজেলা মোড় মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইউটার্ন। ছোট যানবাহনের জন্য আলাদা লেন না থাকায় অটোরিকশাগুলো অনেক সময় উল্টো পথে এসে সড়ক পার হয়। এতে যানজটের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক পার হতে হয়। কখনো কখনো অ্যাম্বুলেন্সও যানজটে আটকে পড়ে।
অটোরিকশাচালক ইব্রাহিম বলেন, চালকদের একটি নিয়মের মধ্যে আনা হলে দুর্ঘটনা কমবে। আশপাশের উপজেলাগুলো থেকে প্রায় ৫০০ অটোরিকশা শেরপুরে আসে। এসব যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সড়কের চাপ কমবে। চালকদের সংগঠনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরবে।
আরেক চালক সফিকুল বলেন, শেরপুরের পাশাপাশি আশপাশের উপজেলাগুলো থেকেও অটোরিকশা এসে শহরে চলাচল করে। এতে সড়কে চাপ বাড়ে। পৌরসভার মাধ্যমে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হলে ভালো হয়। নতুন চালকদের প্রশিক্ষণ না থাকায় তাঁরা ট্রাফিক সংকেত বুঝতে পারেন না। অনেকে উল্টো পথে গাড়ি চালান, এতে দুর্ঘটনা ঘটে।
চালক সোহেল রানা বলেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স নেই। মহাসড়কে অটোরিকশা উল্টো পথে চলে। নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ ও নিয়মের মধ্যে আনা হলে চালকদের জন্যও ভালো হবে।
শেরপুর শহর রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান (লিটন) বলেন, শেরপুর শহরে তিন হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও থ্রি-হুইলার রয়েছে। এসব চালকের অধিকাংশের প্রশিক্ষণ নেই। তাঁরা সড়কের নিয়মকানুনও ভালোভাবে জানেন না। এতে সড়কে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
মাহমুদুল হাসান বলেন, হঠাৎ করে যে কেউ যাতে অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নামতে না পারেন, সে জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে প্রকৃত চালকদের কার্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। অটোরিকশাগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনাই তাঁদের লক্ষ্য।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শেরপুরে পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকায় স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য অটোরিকশার ওপর নির্ভর করেন অনেকে। অন্য অনেক পেশার তুলনায় অটোরিকশা চালানো সহজ হওয়ায় নতুন চালকও যুক্ত হচ্ছেন। ফলে বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। অন্যদিকে মহাসড়কে এসব যান চলাচলের কারণে দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও ইউটার্নে তৈরি হচ্ছে যানজট।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট শ্রেণির যানবাহন সড়কে বৈধভাবে চালাতে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ, বীমা ও চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ প্রযোজ্য কাগজপত্র থাকতে হয়। তবে প্রচলিত নিবন্ধনব্যবস্থার বাইরে থাকা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে এসব বিধান ও রাজস্ব কাঠামোর প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে সারা দেশে থ্রি-হুইলার দুর্ঘটনায় ৭৮ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন। একক জেলা হিসেবে বগুড়ায় সর্বোচ্চ ৩৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি। এর আগে জুলাইয়ে ১৩১টি থ্রি-হুইলার দুর্ঘটনায় ৯৪ জন এবং জুনে ১১২ জন যাত্রী নিহত হন। শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আইয়ুব আলী বলেন, যানজট নিরসনে হাইওয়ে পুলিশ তৎপর রয়েছে। অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত যান সার্ভিস লেন দিয়ে চলাচল করতে পারবে। তবে অনেক জায়গায় সার্ভিস লেন না থাকায় এসব যান মূল সড়কে উঠে আসে। মহাসড়কের অটোরিকশা স্ট্যান্ডগুলোতে মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হয়। উপজেলা মোড় ও ধুনট ইউটার্নে নিয়মিত ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে।
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, শেরপুর শহর জনবহুল হওয়ায় এখানে প্রচুর অটোরিকশা চলাচল করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উল্টো পথে চলাচল ও সড়কের নিয়ম না মানার কারণে যানজট সৃষ্টি হয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হাইওয়ে পুলিশকে বলা হবে। পাশাপাশি সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।


