রংপুর প্রতিনিধিঃ
রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া উপজেলা এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের ১–৯ নম্বর ওয়ার্ড) আসনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে।
প্রতীক বরাদ্দের পর মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। এ দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠলেও নিয়মিত গণসংযোগ ও সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি এই আসনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ওয়ার্ড ও ইউনিয়নভিত্তিক সভা-সমাবেশ, সাংগঠনিক বৈঠক এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের মাধ্যমে মাঠ চাঙা রাখছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
বিএনপি প্রার্থী মো. মোকাররম হোসেন সুজনের পক্ষে তুলে ধরা হচ্ছে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি এবং এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা। চারবারের নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোকাররম হোসেন সুজন এলাকায় সুপরিচিত মুখ।
স্থানীয় ভোটারদের মতে, জনবান্ধব ও সহজ-সরল মানুষ হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কোলকোন্দ ইউনিয়নের সালাম মিয়া, নিয়ামত কুকরুল এলাকার তরুণ ভোটার নাঈম, গজঘটার জাফর আলী ও আলমবিদিতরের সাইফুল জানান, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার ক্ষমতাই সুজনের বড় শক্তি। তাদের ভাষায়, “এবার ধানের শীষেই ভোট দেব।” এদিকে বিএনপি জোটের শরিক গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. হানিফুর রহমান সজীব মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করায় এই আসনে বিএনপির অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে। দলটির প্রার্থী মো. রায়হান সিরাজী শুরু থেকেই মাঠে সক্রিয় থাকায় এলাকায় তার পরিচিতি বেড়েছে। জামায়াত নেতাকর্মীদের দাবি, সরকার পরিবর্তনের পর সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
নোহালীর জমিয়ার, গঙ্গাচড়ার তাজরুল ও গজঘণ্টার রহিম বলেন, “অতীতে জামায়াতের ওপর দমন-পীড়ন হয়েছে। মানুষ সেই অন্যায় দেখেছে। এবার ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবে।” কোলকোন্দ ইউনিয়নের চর চিলাখাল এলাকার ভোটার সাজু মিয়া বলেন, “এর আগে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির এমপি দেখেছি। এবার দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিয়ে জামায়াতের রাষ্ট্র পরিচালনা দেখতে চাই।”
নোহালীর রামচন্দ্র জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে তিনি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন। জামায়াত জোটের শরিক এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরাও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে রায়হান সিরাজীর পক্ষে মাঠে কাজ করছেন। এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিয়মিত পথসভা, গণসংযোগ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। দলটির প্রার্থী এটিএম গোলাম মোস্তফা বাবু আগেভাগেই প্রচারণা শুরু করেছেন। উপজেলা শাখার সেক্রেটারি মাওলানা ইউনুস আলী বলেন, “মানুষ দুর্নীতি ও লুটপাটের রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়।
আমরা ইনসাফভিত্তিক রাজনীতির কথা বলছি। হাতপাখা চমক দেখাবে।” এ ছাড়া ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ থেকে মো. আনাস (চেয়ার প্রতীক) এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) থেকে আহসানুল আরেফিন (কাঁচি প্রতীক) এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উল্লেখ্য, রংপুর-১ আসন দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। এরশাদ সরকারের সময় থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরাই নির্বাচিত হন। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনে দলটি ‘বিনা ভোটের এমপি’ বিতর্কে পড়ে এবং সর্বশেষ নির্বাচনে পরাজিত হয়। চলতি নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. মঞ্জুম আলীর প্রার্থিতা আদালতের আদেশে বাতিল হওয়ায় ত্রিমুখী লড়াই এখন কার্যত দ্বিমুখীতে রূপ নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গঙ্গাচড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস ছবুর বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার জানান, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ২৪ হাজার ৩১২ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ২৩ হাজার ১৭১ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ২ জন।


