হক আমিন, কুড়িগ্রাম ঃ
ভোরের আলো ফোটার আগেই সোনাহাট বাজারের এক কোনে টুঙটাঙ শব্দ জানান দেয়, নতুন দিনের শুরু । আগুনের লেলিহান শিখা আর হাতুড়ির ছন্দে সেখানে গড়ে ওঠে গ্রামবাংলার গৃহস্থ জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী । এ শব্দের কারিগর ৬০ বছর বয়সী ইসমাইল শেখ। পেশায় কামার, অভিজ্ঞতায় ৩০ বছর।
কুড়িগ্রাম জেলার ভৃরুঙগামারী উপজেলার সোনাহাট বাজারে তার ছোট্ট কারবার । টিনের চালা আর মাটির চুল্লি- দেখতে সাধারণ, কিন্তু কাজের নিপুণতায় অসাধারণ । দা, কাঁচি, কুড়াল, কোদাল, ছুরিসহ গৃহস্থের দরকারি এসব জিনিস মুহূর্তেই তৈরি করে ফেলেন তিনি । পুরোনো ভাঙ্গা লোহা আগুনে তাপে লাল করে, তারপর নির্দিষ্ট মাপে কেটে, হাতুড়ির ঘায়ে ঘায়ে আকার দেন। ধাতুর রঙ, আগুনের তাপ আর শব্দের সুর শুনেই তিনি বুঝে যান, কখন লোহা প্রস্তুত ।
ইসমাইল শেখের এ পথচলা সহজ ছিল না । কৈশোরেই বাবা ইব্রাহীম শেখের হাত ধরে কামারের কাজ শেখা। তখন বাজারে দেশীয় কারিগরের কদর ছিল বেশী । এখন সময় বদলেছে- কারখানায় তৈরি রেডিমেড পন্য সহজলভ্য । তবু গ্রামাঞ্চলের মানুষ এখনও ছুটে আসেন তার কাছে ।
কারন তার হাতে তৈরি জিনিস টেকসই ও মজবুত । অনেকেই বলেন, ইসমাইলের দা একবার কিনলে বছর পার হয়ে যায়, ধার কমে না।
দিনভর আগুনের পাশে কাজ করতে করতে শরীর ক্লান্ত হয়। তবু থেমে থাকেন না তিনি। কাজের প্রতি ভালোবাসাই তার প্রেরণা । তিনি বলেন, ” লোহার সঙ্গে আমার সারা জীবনের সখ্য । এ আগুন আর হাতুড়ির শব্দই আমার জীবন।”
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির প্রভাবে অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা হারিয়ে যাচ্ছে । কামারশিল্পও তার ব্যতিক্রম নয়। তবু ইসমাইল শেখদের মতো অভিজ্ঞ কারিগরদের হাতে তৈরি সামগ্রী শুধু প্রয়োজন মেটায় না, বহন করে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা।
সোনাহাট বাজারে এ প্রবীন কামার আজও নতুন প্রজন্মকে শেখাতে আগ্রহী। তার ইচ্ছা- কেউ যদি আগ্রহ নিয়ে আসে, তিনি নিজের অভিজ্ঞতার ভান্ডার উজাড় করে দেবেন। কারন তিনি জানেন, আগুনে পেটানো লোহা যেমন শক্ত হয়, তেমনি অভিজ্ঞতায় গড়া হাতই ধরে রাখে ঐতিহ্যের শক্ত ভিত।
ইসমাইল শেখ একজন সাধারণ কামার নন, তিনি গ্রামবাংলার শ্রম, দক্ষতা ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক ।


