রংপুর প্রতিনিধিঃ
গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা ও গভীর শ্রদ্ধায় চিরবিদায় নিলেন উত্তরাঞ্চলের সাংবাদিকতার বাতিঘর, রংপুর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্মিলিত সাংবাদিক সমাজের আহ্বায়ক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আব্দুস সাহেদ মন্টু।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বাদ আসর রংপুর মহানগরীর ফায়ার সার্ভিস মসজিদ মাঠে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাঁকে বড় নুরপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে ভোর ৪টার দিকে তিনি নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের গণমাধ্যম অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে।
দুপুরে তাঁর মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় রংপুর প্রেসক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন–আরপিইউজে, সম্মিলিত সাংবাদিক সমাজ, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, টেলিভিশন ক্যামেরা জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সাংবাদিক, পেশাজীবী ও রাজনৈতিক সংগঠন।
নামাজে জানাজায় গণমাধ্যমকর্মীদের পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, পেশাজীবী, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
জানাজায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, আব্দুস সাহেদ মন্টু ছিলেন উত্তরাঞ্চলের সাংবাদিকদের অভিভাবক। তাঁর হাত ধরেই প্রথম সংবাদ প্রকাশ পায় দহগ্রাম–আংগরপোতা নিয়ে, যা পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের অংশ হয়।
মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সাংবাদিকদের ঐক্য ও অধিকার রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। রংপুর সম্মিলিত সাংবাদিক সমাজের আহ্বায়ক হিসেবে তাঁর ডাকে সব সংগঠনের সাংবাদিকরা একত্র হয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর সাহস, সততা ও পেশাদারিত্ব ভবিষ্যৎ সাংবাদিকদের পথচলার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন বক্তারা।
সাংবাদিক আব্দুস সাহেদ মন্টু স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর সহধর্মিণী একজন গৃহিণী। কন্যা শামিনা সাহেদ চৈতি ইংরেজিতে এমএ সম্পন্ন করে একটি বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন এবং বর্তমানে পারিবারিক জীবনে নিয়োজিত। তাঁর ছেলে তামজিদ হাসান চার্লি ইংরেজিতে এমএ সম্পন্ন করে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন।
আব্দুস সাহেদ মন্টু ১৯৪৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর রংপুর মহানগরীর জি.এল. রায় রোড মন্ডনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতৃপুরুষদের আদি নিবাস বদরগঞ্জ উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের মাদারগঞ্জে। তাঁর পিতা মরহুম আব্দুস সামাদ এবং মাতা মরহুমা শহিদা খাতুন। তিনি নগরীর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং ১৯৬৪ সালে কৈলাশ রঞ্জন হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন।
পরবর্তীতে রংপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। সাংবাদিক আব্দুল মজিদের অনুপ্রেরণায় ১৯৬৪ সালে দৈনিক আজাদী পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয়। এরপর তিনি দৈনিক পয়গামে কাজ করেন এবং পরবর্তীতে পিপিআইতে যুক্ত হন।
দীর্ঘ ৬০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে তিনি ১৯৭৬ সালে ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ টাইমস-এর রংপুর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর রংপুর প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সে রংপুর প্রতিনিধি হিসেবে যুক্ত হয়ে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
একই সময়ে ১৯৮৬ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি বিবিসি বাংলার রংপুর প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যুক্ত থেকে তিনি রংপুর অঞ্চলসহ দেশের মাটি ও মানুষের কথা বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন। বিশেষ করে রয়টার্স ও বিবিসি বাংলায় মফস্বল থেকে পাঠানো তাঁর সংবাদ উত্তরাঞ্চলের সাংবাদিকতাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করেছে।
তিনি রংপুর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রংপুর সম্মিলিত সাংবাদিক সমাজের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি একজন সমাজসেবকও ছিলেন। রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির আজীবন সদস্য হিসেবে তিনি শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারেও ভূমিকা রাখেন।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি পদকসহ রংপুর ফাউন্ডেশন, রংপুর জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠন থেকে সম্মাননা লাভ করেন।


