রংপুর প্রতিনিধি
রংপুর: দ্রুত নগরায়ণের পথে এগিয়ে চলা বিভাগীয় শহর রংপুরে এখন সবচেয়ে বড় নাগরিক দুর্ভোগগুলোর একটি হয়ে উঠেছে বৈদ্যুতিক, ইন্টারনেট, টেলিফোন ও ক্যাবল টিভির অপরিকল্পিত ঝুলন্ত তারের জঞ্জাল। নগরীর প্রধান সড়ক, ফুটপাত, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি অফিস, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়জুড়ে খুঁটির পর খুঁটিতে জট পাকিয়ে ঝুলছে অসংখ্য তার। কোথাও তা মানুষের মাথার সমান উচ্চতায় নেমে এসেছে, কোথাও আবার বিশাল জটলা তৈরি করে জননিরাপত্তা ও নগর সৌন্দর্যের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সিও বাজার, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, মেডিকেল মোড়, কেন্দ্রীয় কারাগার, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, মাছের বাজার, তাজহাট, মডার্ন মোড়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, মাহিগঞ্জ, সাতমাথা, কামাল কাছনা, রোকেয়া কলেজ, লালবাগ, জাহাজ কোম্পানি মোড়, শাপলা চত্বর, রেলওয়ে স্টেশন, প্রেসক্লাব, পায়রা চত্বর, টাউন হল, কাচারি বাজার, আদালত চত্বর, ডিসি মোড় ও ব্যাংকের মোড়সহ প্রায় পুরো মহানগরজুড়েই একই চিত্র বিরাজ করছে। বিদ্যুতের খুঁটিতে একাধিক ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, ক্যাবল অপারেটর ও টেলিযোগাযোগ সংস্থার তার এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে মূল বিদ্যুৎ লাইন ও যোগাযোগ লাইন আলাদা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। নগরবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যা বিদ্যমান থাকলেও এর স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু তার অপসারণ করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন করে সংযোগ দেওয়া হয়। ফলে নগরীর সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির আশঙ্কা। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। প্রবল বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় তার ছিঁড়ে সড়কে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে, যা পথচারী ও যানবাহনের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে। পানি জমে থাকা এলাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত ও জট পাকানো সংযোগ শর্ট সার্কিটের অন্যতম কারণ এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।
একসময় পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরী হিসেবে পরিচিত রংপুর আজ ঝুলন্ত তারের জঞ্জালে তার নান্দনিকতা হারাতে বসেছে। সড়কের সৌন্দর্যবর্ধন, আলোকসজ্জা, বৃক্ষরোপণ কিংবা আধুনিক স্থাপনাগুলোর দৃশ্যও অনেক ক্ষেত্রে তারের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি আধুনিক শহরের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হলো সুসংগঠিত ইউটিলিটি অবকাঠামো এবং উন্নত বিশ্বের মতো পর্যায়ক্রমে ভূগর্ভস্থ ক্যাবলিং ব্যবস্থার দিকে এগোনোই হতে পারে টেকসই সমাধান। আইনগত দিক থেকেও অবৈধ ঝুলন্ত তার অপসারণের পর্যাপ্ত ভিত্তি রয়েছে। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী জনউপদ্রব ও নগর সৌন্দর্যহানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা সিটি কর্পোরেশনের রয়েছে। একইভাবে বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১ এবং কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া অবকাঠামো ব্যবহার ও অনিয়ন্ত্রিত সংযোগ শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
রংপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিব হাসান বলেন, নগরীর সৌন্দর্য ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিকবার মোবাইল কোর্ট ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, শুধু তার অপসারণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে ধাপে ধাপে আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলিং ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে নেসকোর রংপুর বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, বিদ্যুতের খুঁটিতে অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের সংযোগ দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ও জননিরাপত্তা উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়ে। অবৈধ সংযোগ শনাক্ত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা হবে। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নগর এলাকায় সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য অংশের পেছনে বৈদ্যুতিক ত্রুটি ও শর্ট সার্কিট দায়ী। ঝুলন্ত ও জট পাকানো তার আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই বিষয়টিকে শুধু সৌন্দর্যহানির সমস্যা হিসেবে নয়, বরং জননিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
টেলিযোগাযোগ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতে একক ডাক্টিং ব্যবস্থা গড়ে তুলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একই অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ দিলে যেমন নগরীর সৌন্দর্য রক্ষা পাবে, তেমনি কমবে অব্যবস্থাপনা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। এদিকে সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, প্রয়োজনীয় আইন, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং ঝুঁকির বিষয়টি সবার জানা থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর একই সমস্যা কেন বহাল রয়েছে। তাদের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়; বরং রংপুর সিটি কর্পোরেশন, নেসকো, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগ, বিটিআরসি, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও ক্যাবল অপারেটরদের সমন্বয়ে একটি বাস্তবসম্মত মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি। নগরবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে রংপুরের আকাশ থেকে বিশৃঙ্খল তারের জাল সরিয়ে একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক নগর পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।


