২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে যাচ্ছে। তবে এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো দণ্ডায়মান, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় তিনটি হলো— আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, গুজবের প্রসার এবং সামাজিক মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য এই তিনটি বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
প্রথমত, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নির্বাচনকে প্রভাবিত করার সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, নির্বাচনের আগে ও পরে রাজনৈতিক সহিংসতা, সংঘর্ষ, ভোটকেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এসব ঘটনা শুধু ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে না, বরং নির্বাচনের বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এর প্রতিকার হিসেবে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রত্যেক নাগরিক যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতেই হবে।
দ্বিতীয়ত, গুজব নির্বাচনকালীন সময়ে এক ভয়ঙ্কর অস্ত্রে পরিণত হয়। গুজব ছড়ানোর উদ্দেশ্য সাধারণত জনমতকে প্রভাবিত করা, ভোটারদের বিভ্রান্ত করা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করা। বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি, নির্বাচনের দিন কিংবা আগের রাতে ভুয়া খবর ছড়িয়ে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার অপচেষ্টা হয়েছে। আজকের ডিজিটাল যুগে গুজব আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে— একবার ছড়ালে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই গুজবের উৎস চিহ্নিত করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো ও জনসচেতনতা তৈরি করাই হতে পারে এর একমাত্র প্রতিরোধ।
তৃতীয়ত, সামাজিক মাধ্যম এখন রাজনৈতিক প্রচারণার প্রধান মাধ্যম হলেও, এর অপব্যবহারও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, এক্স (সাবেক টুইটার)-এ প্রতিনিয়ত ভুল তথ্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, মনগড়া গল্প ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালানো হয়। এসব তথ্য অনেক সময় সহিংসতার ইন্ধন দেয় এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ায়। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে ডিজিটাল সাক্ষরতা এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত, সেখানে সাধারণ জনগণ সত্য-মিথ্যার ফারাক করতে গিয়ে বিভ্রান্ত হন। এই বিভ্রান্তি থেকে রাজনৈতিক সংঘাত ও বিশৃঙ্খলার জন্ম নেয়। এজন্য ডিজিটাল মিডিয়ার ওপর নজরদারি, সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নির্বাচনী সময়ে সামাজিক মাধ্যমগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ভুয়া তথ্য শনাক্ত ও দমন করাও অপরিহার্য।
এই তিনটি সমস্যা শুধু প্রশাসনের নয়, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব। রাজনৈতিক দলগুলোকে চাই সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণ। গুজব কিংবা ভুল তথ্য ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার অপচেষ্টা দেশের গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। নাগরিক সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে সচেতনতা তৈরিতে এবং সত্য তথ্য যাচাই করে ছড়াতে। গণমাধ্যমকে হতে হবে নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক। বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো দেশের প্রত্যন্ত এলাকাতেও যেন এই বার্তা পৌঁছে— “আমার ভোট, আমার অধিকার, গুজবে নয়, সত্যে করি নির্বাচন।”
সবশেষে, একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তা যেন শান্তিপূর্ণ হয়, সেটাও অপরিহার্য। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, গুজব রোধ এবং সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার প্রতিরোধ করা না গেলে, সেই নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে। তাই এখনই সময়, রাষ্ট্রের সব পক্ষ একসাথে কাজ করে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করার।


