বরেন্দ্রকণ্ঠ ডেস্ক
নেপালে হিমবাহ ধস ও পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যার পর এর প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে কি না, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেপালের বন্যার পানি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দীর্ঘ নদীপথ অতিক্রম করার কারণে এই পানির তীব্রতা অনেকটাই কমে যেতে পারে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক বড় বন্যার আশঙ্কা কম।
নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া এলাকায় আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাহাড় থেকে হিমবাহ ও পাথরের ধস নেমে নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও পাথর নিচের দিকে নেমে আসে। এতে অল্প সময়ের মধ্যে নদীর পানির উচ্চতা কয়েক মিটার বেড়ে যায়।
নেপালের এই ঢলের পানি ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী হয়ে নারায়ণী-গণ্ডক নদী ব্যবস্থায় প্রবেশ করবে। পরে গণ্ডক নদী ভারতের বিহার হয়ে গঙ্গায় মিশবে। গঙ্গার প্রবাহের সঙ্গে এই পানি ফারাক্কা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।
তবে নেপাল থেকে বাংলাদেশে আসার পথে পানিকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। এ সময় নদীর পানি বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে এবং পলি জমার কারণে স্রোতের গতি কমে যাবে। ফলে উৎসস্থলে যে মাত্রার ভয়াবহতা দেখা গেছে, বাংলাদেশে পৌঁছানোর সময় তা অনেকটাই কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এখনই বড় বন্যার আশঙ্কা কম
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মুশফিকুস সালেহীনের মতে, নেপালের বর্তমান বন্যার কারণে বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তবে উজানের নদীগুলোর পানির উচ্চতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের গবেষক মো. আজাহার হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক দিনে উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে। নেপালের বন্যার পানির সঙ্গে নতুন করে বৃষ্টির পানি যুক্ত হলে গঙ্গা অববাহিকায় দ্বিতীয় দফায় পানির চাপ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের বন্যার উৎস থেকে বাংলাদেশের নদীপথের দূরত্ব প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার। এতটা পথ অতিক্রম করার সময় পানির গতি ও উচ্চতা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। তাই সরাসরি ভয়াবহ বন্যা বাংলাদেশে আঘাত হানার আশঙ্কা আপাতত কম।
নজরে ভারত
বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রভাব নির্ধারণে শুধু নেপালের পরিস্থিতি দেখলেই হবে না। ভারতের বিহার, উত্তর প্রদেশসহ গঙ্গা অববাহিকার বৃষ্টিপাত এবং নদীগুলোর পানির উচ্চতাও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ফারাক্কা ও সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানির গতিপ্রকৃতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ভারতের গঙ্গা অববাহিকায় বৃষ্টিপাতের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এতে বাংলাদেশে সম্ভাব্য পানির চাপ সম্পর্কে আগাম সতর্কতা পাওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১০ দিনে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা নেই। ফলে নেপালের বর্তমান বন্যা নিয়ে বাংলাদেশে এখনই বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে না।
ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা
তবে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলে হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি ভবিষ্যতে বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে হিমবাহ ও হিমবাহজাত হ্রদের পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনাকে শুধু একটি দেশের দুর্যোগ হিসেবে না দেখে পুরো হিমালয়-গঙ্গা অববাহিকার জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। উজানের পরিস্থিতির দ্রুত তথ্য সংগ্রহ এবং সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর প্রস্তুতি হতে পারে।


