বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজ
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত আইরিন খান।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারে। তাই এর টেকসই সমাধানও সেখানেই খুঁজতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আইরিন খান বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাচ্ছে এবং বিশ্বের মনোযোগও অন্য সংকটের দিকে সরে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আরও জোরালো সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে।
তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় দেশটির পাশে দাঁড়ানো। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করা।
আইরিন খান বলেন, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠী বর্তমানে বাংলাদেশের অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আশ্রয় নিয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে শিবিরে বসবাস করায় বিশেষ করে শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
তিনি বলেন, প্রায় নয় বছর ধরে রোহিঙ্গারা শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছে। সেখানে বেড়ে উঠছে একটি নতুন প্রজন্ম। প্রতিবছর শিবিরগুলোতে প্রায় ৩০ হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। এই শিশুদের ভবিষ্যৎ কী হবে—এ প্রশ্নের উত্তর এখনই খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তবে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তুলে ধরেন আইরিন খান।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং সমাধানও সেখানেই নিহিত। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগ দিতে হবে এবং প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ ও সহযোগিতা দুটিই প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের প্রত্যাশা সম্পর্কে জানতে চাইলে আইরিন খান বলেন, জাতিসংঘের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একটি আলোচনার টেবিলে আনতে হবে। সেখানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক দেশগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। মিয়ানমারের ওপর প্রভাব রয়েছে কিংবা সংকট সমাধানে অর্থায়নের সক্ষমতা রয়েছে—এমন দূরবর্তী দেশগুলোকেও এ প্রক্রিয়ার অংশ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে একটি কার্যকর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দরকার। এর মাধ্যমে মিয়ানমারকে নিজ দেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পর তাদের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের ভেতরে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে।
জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে সাম্প্রতিক সমালোচনার প্রসঙ্গে আইরিন খান বলেন, এ ধরনের জটিল সংকট একা জাতিসংঘের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। সংস্থাটির সদস্য রাষ্ট্রগুলোকেও নিজেদের দায়িত্ব আরও গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতে হবে।
বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাধারী দেশগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও উদ্যোগ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
এদিকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।


