বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজঃ
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সময়সীমা আড়াই থেকে তিন বছর পর্যন্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে। পাশাপাশি প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) বার্ষিক প্রশিক্ষণ সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৪২ হাজারে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব পরিকল্পনার কথা জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে নতুন প্রশিক্ষণ কাঠামো গড়ে তোলার কাজ চলছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা প্রথমে পিটিআইতে দুই মাসের আবাসিক প্রশিক্ষণ নেবেন। এরপর বিদ্যালয়ে পাঠদানের পাশাপাশি অনলাইন ও অফলাইন পদ্ধতিতে বাকি প্রশিক্ষণ মডিউল এবং নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করবেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণের জন্য নতুন মডিউল তৈরির কাজ চূড়ান্ত করেছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ)। নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে এই মডিউল ব্যবহার করা হবে। দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ কাঠামোর পরিকল্পনার সঙ্গে এর বাস্তবায়ন কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ও
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে শুধু পিটিআইয়ের ওপর নির্ভর না করে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগগুলোকেও সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণের আওতায় আনার কথা ভাবছে সরকার।
ববি হাজ্জাজ বলেন, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো শিক্ষককে স্থায়ীভাবে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের দায়িত্বে রাখার বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিক্ষকদের আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের শেখার ধরন এবং শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে তোলাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
২০২৭ সালের মধ্যে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিলের লক্ষ্য
শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা ও বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়াতে দেশজুড়ে মিড-ডে মিল কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৫০টি উপজেলায় এ কর্মসূচি চালু রয়েছে। বাকি উপজেলাগুলোতে কার্যক্রম সম্প্রসারণে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে।
সরকারের লক্ষ্য, ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ শিক্ষার্থীর জন্য পুষ্টিকর দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা। তবে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রকল্পের অগ্রগতি ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
শিক্ষকদের হাতে ট্যাব, দুর্গম বিদ্যালয়ে সৌরবিদ্যুতের পরিকল্পনা
প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ এবং স্মার্ট ক্লাসরুম উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, এর উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষকদের হাতে ডিজিটাল ডিভাইস তুলে দেওয়া নয়; বরং শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদানের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা।
এ জন্য আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ডিজিটাল শিক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যুৎবিহীন দুর্গম বিদ্যালয়গুলোতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতেও সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কাজ চলছে।
শূন্য প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির উদ্যোগ
দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকার বিষয়েও কথা বলেন ববি হাজ্জাজ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আদালতের রায়ের চূড়ান্ত সার্টিফায়েড কপি পাওয়ার পর পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পথও সহজ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এ বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
আনন্দদায়ক শিক্ষা ও দুর্গম এলাকার শিক্ষকদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ
শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত বইয়ের চাপ কমিয়ে পাঠদানকে আরও আনন্দদায়ক করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। গল্পের মাধ্যমে শেখানো এবং গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মতো কার্যক্রম পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
এ ছাড়া হাওর, চর ও দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে কর্মরত শিক্ষকদের উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতা এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সমস্যা কমাতে আবাসিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।
সরকারের এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, শিক্ষার্থীদের পুষ্টি এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রশিক্ষণ কাঠামোর চূড়ান্ত মেয়াদ, সক্ষমতা সম্প্রসারণ ও অন্যান্য উদ্যোগের বাস্তবায়ন অগ্রগতি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত, অর্থায়ন ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির ওপর।


