রম্য লেখক, আমিনুল হকঃ
গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতির আরেকটি অমূল্য ঐতিহ্য হল যাত্রা ও যাত্রাপালা। বিদ্যুৎ, টেলিভিশন, রেডিও বা সিনেমা হলের আগমনের আগে গ্রামে চিত্তবিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই যাত্রাপালা। তাই এটি গ্রামবাংলার মাটি ও মানুষের অন্তরের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে গেছে।
জীবনযাত্রার ক্লান্তি, পরিশ্রম ও একঘেয়ামি কখনও কখনও মানুষকে অতিষ্ঠ করে। তখন একটুখানি প্রশান্তি ও আনন্দের জন্য গ্রামীণ মানুষ ছুটে যেত যাত্রাপালা দেখতে। চোখে ভেসে ওঠে সেইসব রঙিন চরিত্র “কাসেম মালার প্রেম”, “ঘুনাই বিবি”, “সাগর ভাসা”, “রাখাল বন্ধু”, “রূপবান”, “নবাব সিরাজ উদ-দৌলা”, “দেবী সুলতানা”, “দশশু ফুলন”, “সূর্য সাক্ষী”, “আনার কলি”, “বেত কন্যা”, “সোহরাব রুস্তম”।
যাত্রাপালার শিল্পীরা তাঁদের অভিনয়, অঙ্গভঙ্গি ও বাদ্যের তাল মেলানো নাচ-গানের মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করতেন। দেশের খ্যাতনামা যাত্রাপার্টিগুলো যেমন- “কোহিনূর অপেরা”, “স্বদেশী পার্টি”, “বাবুল অপেরা”, “তুষার অপেরা”, “বুলবুল অপেরা”, “নবজাগরণ অপেরা” বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে ঘুরে এই যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করতো। আধো আলো-অন্ধকারের পরিবেশে দর্শক এবং শ্রোতারা তন্ময় হয়ে উপভোগ করতো হাসি, কান্না এবং আনন্দময় প্রতিটি দৃশ্য।
যাত্রাপালা কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; এটি শিক্ষণীয়ও ছিল। প্রেম, বিরহ, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং পৌরাণিক কাহিনীর গল্প মানুষের অন্তরে মানবিক শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক বোধ জাগিয়ে তুলতো।
কিন্তু কালের বিবর্তনে এবং প্রযুক্তির আধুনিক যুগে আনন্দ-বিনোদনের নানা মাধ্যম এখন হাতে আসে সহজেই। ফলশ্রুতিতে গ্রামবাংলার শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য যাত্রা ও যাত্রাপালা আজ বিলুপ্তির পথে। হয়তো নতুন প্রজন্মের কাছে যাত্রার সেই সুদিন আর ফিরে আসবে না। তবে যাত্রার গল্প, চরিত্র ও কাহিনী যুগ যুগান্তর মানুষের স্মৃতিতে থাকবে।


