আমিনুল হকঃ
একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি জনপদে দেখা মিলত ঘানি। চোখ বাঁধা বলদের ধীর পায়ে টানা সেই ঘানি ঘুরত দিনভর, আর ভাঙ্গত সরিষা, তিল, তিসি। গ্রাম্য প্রবাদে আজও শোনা যায় ” কলুর বলদ ” অবিরাম পরিশ্রমের প্রতীক হয়ে । যন্ত্র সভ্যতার দাপটে সেই ঘানির যুগ অনেক আগেই ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে। কিন্তু এখনও এক টুকরো অতীত নি:শব্দে টিকে আছে কুড়িগ্রামের ভূরুঙগামারী-তে।
উপজেলার পাইকের ছড়া সোনাহাট মহাসড়কের পাশেই রয়েছে মোসলেম উদ্দিনের ব্যতিক্রম ঘানি। চারদিকে আধুনিক অয়েল মিলের যান্ত্রিক শব্দ, অথচ এখানে ঘুরছে কাঠের ঘানি-তবে বলদে নয়, ঘোড়ায় টানা। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলদের পরিবর্তে ঘোড়াকে বেছে নিয়েছেন তিনি । তাই এ ঘানিকে ঘিরে কৌতুহলের শেষ নেই।
মোসলেম উদ্দিন জানান, গত পাঁচ বছর ধরে এ ঘানির সঙ্গে জীবন জীবিকা বেঁধেছেন। প্রথমে বলদ দিয়েই ঘানি টানা হতো। তবে ছয় মাস হল ঘোড়া দিয়ে ঘানি টানা হচ্ছে । ঘোড়াটির মূল্য পড়েছে আট হাজার টাকা। ঘোড়া তুলনামূলক দ্রুত চলে, কম সময়ে বেশী তেল উত্পাদন সম্ভব হয় । ফলে ঐতিহ্য অটুট রেখেই কিছুটা আধুনিকতার ছোঁয়া এসেছে তাঁর কাজে।
ঘানির চার পাশে অনেকে ভিড় করেন স্থানীয় মানুষ । কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, ঘানিতে ভাঙ্গানো সরিষার তেলের স্বাদ ও গুনগত মান যন্ত্রে উত্পাদিত তেলের চেয়ে ভাল। কাঠের চাপে ধীরে ধীরে তেল বের হওয়ায় এর পুষ্টিগুন অক্ষুণ্ণ থাকে। বিশেষ করে শীতকালে খাঁটি সরিষার তেলের চাহিদা বাড়ে ।
মোসলেম উদ্দিনের ভাষায়, যন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। তবুও মানুষ এখনও খাঁটি জিনিস খোঁজে। এটাই আমার ভরসা।
স্থানীয় বাসিন্দা হারেস মিঞার মতে, এটি শুধু একটি তেল ভাঙ্গনের যন্ত্র নয়, এটি একটুকরো জীবন্ত ইতিহাস। নতুন প্রজন্মের অনেকেই কেবল বইয়ে পড়েছে ঘানির কথা। কিন্তু এখানে এসে তারা দেখতে পায় গ্রামীন ঐতিহ্যের বাস্তব রূপ।
যেখানে প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে জীবনযাত্রা, সেখানে ভূরুঙগামারীর এ ঘানি মনে করিয়ে দেয়- সব পুরোনো হারিয়ে যায়নি। কিছু ঐতিহ্য টিকে থাকে মানুষের ভালোবাসা আর আস্থায় । মোসলেম উদ্দিনের ঘানি তাই কেবল একটি জীবিকা নয়, এটি গ্রামবাংলার অতীত ও বর্তমানের এক সেতুবন্ধন ।


