রম্য লেখকঃ
কোকিল- গ্রামবাংলার প্রকৃতিতে খুব পরিচিত অথচ আচরণে রহস্যময় একটি পাখি। বসন্তের দহনভরা সকাল কিংবা গ্রীষ্মের দুপুরে ভেসে আসে তার ডাক-“কু–হু–কু–হু–।” সুরেলা এই ডাকে জেগে ওঠে গ্রামীন প্রকৃতি, জাগে স্মৃতি, কখনও জাগে কবিতার ছন্দ ।
কোকিলই হল এমন প্রজাতির পাখি–যারা নিজেরা বাসা বাঁধে না। প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় খেয়ালের ধারায় তারা বেছে নেয় এক ভিন্ন পথ। কোকিল সাধারণত কাকের বাসায় ডিম পারে। আশ্চর্যজনকভাবে, কোকিলের ডিম দেখতে অনেকটা কাকের ডিমের মতোই–যা কোকিলের বুদ্ধিমত্তাকে সহজ করে তোলে । কাক অজান্তেই সেই ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটিয়ে তোলে। বাচ্চা একটু বড় হলে কাকা টের পায় ধোকা খাওয়ার । তখন নির্দয়ভাবে বাসা থেকে ঠেলে বের করে দেয় কোকিলের বাচ্চকে। এটি প্রকৃতির কঠিন এক নির্মম সত্য ।
দেখতে তুলনামূলক সাধারণ হলেও কোকিল পারদর্শী আড়ালে, আপডালে থাকায় ।গাছের পেছনে, পাতার আড়ালে থাকতেই তারা বেশী পছন্দ করে। এই কারণে যতটা ডাক শোনা যায়, ততটা চোখে পড়ে না। পুরুষ কোকিল কালো রঙের–কাকের মতো, আর ইসতিরি কোকিলের শরীরে বাদামী–সাদা দাগ থাকে। গ্রীষ্ম ঋতুতে তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে প্রকৃতির মাঝে।
কাব্য, সাহিত্য; সঙ্গীত ও লোকসংস্কৃতিতে কোকিলের ডাক এক গভীর আবেগের প্রতীক । কোকিলের কু হু কু হু ডাক বসন্তের বার্তা দেয়। ফাল্গুন-চৈত্র মানেই কোকিলের মুক্ত কন্ঠস্বর । প্রকৃতির সৌন্দর্য ও ঋতু পরিবর্তনের বার্তাবাহক হিসাবে মনে করা হয় এই কালো পাখিকে।
কোকিল কীটপতঙ্গ ও ছোট ছোট পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। কৃষি জমির ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে এরা ভূমিকা রাখে।
নিজস্ব বাসা না থাকা, অন্যের দ্বারা বাচচা বড় করে নেওয়া; অথচ প্রকৃতির সুরেলা বার্তাবাহক–কোকিল যেন বিস্ময়ের এক অনন্য চিত্র । এই পাখি আমাদের শেখায় – প্রকৃতি কখনও সহজ, কখনও কঠিন বৈচিত্র্যময়–কিন্তু সর্বদাই বিস্ময়ে ভরা। কোকিল ঠিক তেমনই– সুরের মোহে হৃদয় জয় করা আর আচরণে অবাক করে দেওয়া পাখি।
কোকিল না থাকলে হয় তো বসন্ত আসত, কিন্তু সেই চেনা অনুভূতির ছোঁয়া থাকতো না। তাই কোকিল শুধু একটি পাখি নয়, সে প্রকৃতির নির্মল সৌন্দর্য ও সুরেলাময় বিস্ময়ের এক অনিবার্য প্রতীক ।


