হক আমীন:
জন্মের আড়াই মাস বয়স। একেবারেই নিষ্পাপ শিশু। এ বয়সে ভয়াবহ এক অগ্নিকান্ডে দগ্ধ হয় শিশু এবাদুল। সেই আগুন কেড়ে নেয় তাঁর দু’চোখের আলো, আর কেটে ফেলতে হয় ডান হাতের অর্ধেক। জীবনের শুরুতেই এমন নির্মম পরিণতি-যেখানে অনেকেই থেমে যেত, সেখান থেকেই শুর হয় এক অনন্য সংগ্রামের গল্প।
গোপালগঞ্জের কুশলী গ্রামের এই মানুষটি আজ পরিচিত বাউল এবাদুল নামে। চোখে দেখতে পান না, শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ নেই, তবুও জীবন যুদ্ধে তিনি পরাজয় মানেননি। ভিক্ষাবৃত্তির সহজ পথ সামনে থাকলেও, তিনি সে পথে হাঁটেননি, বরং বেছে নিয়েছেন সুরের পথ-হারমোনিয়ামের সুর।
ফুটপাত, হাটবাজারে তিনি গেয়ে ওঠেন জীবন, প্রেম, বেদনা, বাস্তব আর আশার গান। তাঁর কন্ঠে যেন ফুটে ওঠে জীবনের সব হারানোর বেদনা, আবার সেই বেদনার মাঝেই জেগে ওঠে বেঁচে থাকার প্রেরণা। হারমোনিয়ামের প্রতিটি সুরে যেন তাঁর চোখের আলো ফিরে আসে। এই বাউলের গানে মুগ্ধ হয়ে, শ্রোতারা যে যা দেন, তা দিয়েই তাঁর দিন গড়িয়ে যায়। মাস পেরিয়ে বছর চলে যায়।
শুধু নিজের জীবনই গড়েননি এবাদুল, দায়িত্ব পালন করেছেন পরিবারেরও। সুরে অর্জিত টাকা দিয়েই তিন বোনকে বিয়ে দিয়েছেন, ছোট থেকে বড় করেছেন দু ভাইকে। নিজের সীমাবদ্ধ কখনোই তাঁকে থামাতে পারেনি, বরং কষ্ট আর সুরের মেলবন্ধনে ৫২ বছরে গড়ে উঠেছে তাঁর জীবনের এক অনন্য সিম্ফনি।
সত্তর বছরের বাউল এবাদুল প্রমান করেছেন-শরীরের অক্ষমতা কখনোই মানুষের অদম্য ইচ্ছা শক্তিকে থামাতে পারে না, যদি মন থাকে দৃঢ়।
অন্ধকারের ভেতর থেকেও তিনি খুঁজে নিয়েছেন আলোর পথ-সেই আলোই আজ ছড়িয়ে দিচ্ছেন সুরের ঝঙ্কারে।
তাঁর জীবন যেন আমাদের “শেখায়-হার মানলে হার, আর লড়াই করলে জীবনেরই জয়।”


