রুশাইদ আহমেদ
ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, দুর্গাপূজা, গ্রীষ্ম কিংবা শীত। এই মৌসুমগুলো বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়ে আসে ছুটির আমেজ। অবশ্য সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য ছুটির গুরুত্বটা সমান নয়। নিজের ক্যাম্পাস থেকে কারো বাড়ি দূরে, কারোর কাছে। কারো ছুটি কাটে কর্মচাঞ্চল্যের মধ্য দিয়ে, আবার কেউ খোঁজেন ব্যস্ত বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে ছাপিয়ে একটুখানি ফুরসত।
অনেকের বাড়ি ফিরতে ফিরতে পথে জমা হয় বহু স্মৃতি। হয়তো ছুটিতে প্রতি সফরেই তাদের গড়ে ওঠে কিছু খুদেগল্প। আবার ছুটি শেষে ভেজা চোখে বাড়ি ছাড়েন কেউ কেউ। ফ্রেশার আর ফাইনাল ইয়ারের শিক্ষার্থীদের অনুভূতিও কখনো মেলে না একই বিন্দুতে। তবু ক্যাম্পাস আর নিজেদের জন্মস্থান — এই দুই ঠিকানার মাঝেই শিক্ষার্থীদের বেঁচে থাকা। তাই দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ছুটি নিয়ে নানা অনুভূতি, অভিজ্ঞতা আর ভাবনার কথা তুলে ধরা হলো এখানে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী খোন্দকার রিয়াসাত ইসলাম অমিয়। ঢাকার চানখারপুলের নাজিমুদ্দিন রোডে বাসা তাঁর। অমিয়-এর কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি একইসঙ্গে আনন্দের এবং কিছুটা বিষণ্নতার। তাঁর ভাষায়, ❝ছুটি শুরু হলে বাড়ি ফেরার আনন্দ কাজ করে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো যায়, মায়ের হাতের রান্না খাওয়া যায়, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ততা, ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট আর পরীক্ষার চাপ থেকে কিছুদিনের মুক্তিও মেলে।❞
তিনি বলেন, “কিন্তু ছুটি যতই আনন্দের হোক, একটা সময় পর রাজশাহীর (বিশ্ববিদ্যালয়) ক্যাম্পাস, বন্ধুদের আড্ডা, হলের জীবন আর প্রতিদিনের চেনা ব্যস্ততাগুলো থেমে থেমে মনে পড়ে। আবার ছুটি শেষে বাড়ি ছেড়ে ফেরার সময়ও মনটা খারাপ হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এটাই —একদিকে বাড়ির প্রতি টান, অন্যদিকে ক্যাম্পাসের প্রতি মায়া।”
তবে, সময়ের সঙ্গে ছুটির অনুভূতিও বদলে যায় বলে মনে করেন এই শিক্ষার্থী। “ক্যাম্পাসে প্রথমদিককার ছুটি মানেই অনেক আনন্দ। অথচ, পড়াশোনার শেষ দিকে এসে মনে হয়, সময়টা খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। একসময় যে ক্যাম্পাসে ফেরার জন্য অপেক্ষা করতাম, একদিন হয়তো সেই ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার স্মৃতিই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেবে। তাই এখন মনে হয়, ছুটি শুধু বিশ্রামের সময় নয়; পরিবারকে সময় দেওয়া, নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়া এবং জীবনের ব্যস্ততার মাঝে প্রিয় মানুষগুলোর কাছে ফিরে যাওয়ার একটা সুযোগও,” যোগ করেন অমিয়।
মাহবুবা আক্তার শান্তি পড়াশোনা করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সন্তান তিনি। শান্তির কাছে, ❝বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছুটি মানে হলো এক অদ্ভুত আমেজ। একাকিত্ব, হতাশা কিংবা সামনে ছুটে চলার একরাশ স্বপ্নের এক মিশ্র অনুভূতির দোলাচল যেন এটি।❞
তিনি বলেন, “সুখ বিসর্জন দিয়ে বিদ্যা অর্জনের এক বাস্তবতাই হলো শিক্ষার্থীদের জীবন। জীবনের তাগিদে আমরা ছুটে চলি অতিথি পাখির মতো। কখনো শিক্ষার খোঁজে বিদ্যাপীঠে, আবার খানিকটা ফুরসত পেলে ছুটির সময়টাতে আমরা ফিরে যাই আমাদের সেই চিরচেনা, সবুজ ঘাসে মোড়ানো জন্মস্থানে। সেখানে ক্লান্তি, হতাশা, দুঃখ সব যেন বিলীন হয়ে যায় এক নিমিষেই। মায়ের হাতের রান্না, নিজ এলাকার নির্মল বাতাস, পাখির কলরবে সব মিলিয়ে কংক্রিটের দেয়ালে ঘেরা জীবনের বাইরে এক প্রশান্তির জগৎ খুঁজে পাই।”
তবে, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ বর্ষে থাকা শিক্ষার্থীদের জীবন কিছুটা আলাদা হয় বলে মন্তব্য করেন শান্তি। তাঁর মতে, “এ সময়ে ছুটির সেই চিরচেনা আমেজ অনেকটাই ম্লান হয়ে আসে। ক্যারিয়ার, পরিবারের দায়িত্ব আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে শিক্ষাজীবনের শেষ দিকে থাকা শিক্ষার্থীদের। ছুটি তখন কখনো বয়ে আনে হতাশা, কখনো পুরোনো স্মৃতির মিষ্টি গল্প। আবার কখনো এনে দেয় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ।”
শান্তির চোখে, “ছুটি পেলেই বোধহয় নিজেকে একটু সময় দেওয়ার সুযোগ পান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রঙিন হওয়ার স্বপ্ন দেখতে দেখতে যাদের জীবন কখনো কখনো ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে — তাদের বাইরের জগতের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার, নিজেকে ফিরে পাওয়ার অন্যতম অবকাশই হলো ছুটি!”
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত নূর ই আফরিন ঋতু। ক্যাম্পাস থেকে তাঁর বাসা নেত্রকোনার মদন উপজেলার দূরত্ব প্রায় ৩২৫ কিলোমিটার। দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীর কাছে তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ছুটিগুলো বরাবরের মতোই আনন্দের। ঋতু বলেন, ❝ছুটি পেলেই অন্য সকল শিক্ষার্থীর মতোই বাড়ি ফেরার তাড়া অনুভব করি। এক ধরনের আলাদা ভালো লাগা কাজ করে তখন। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, মায়ের হাতের রান্না খাওয়া এবং চির পরিচিত পরিবেশে থাকা এই সবকিছুই সবসময়ের মতো উপভোগ্য।❞
তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত জীবনে প্রায়ই এসবের জন্য মন টানে আমাদের। তবে বাড়ি ফেরার আনন্দের পাশাপাশি কিছুটা মন খারাপও থাকে ক্যাম্পাস আর বন্ধুদের জন্য। একসঙ্গে তাদের সাথে ক্লাস করা, আড্ডা দেওয়া, হুটহাট কোথাও ঘুরতে যাওয়া এসব অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় আমাদের। ছুটিতে বাড়িতে বসে থাকলে কখনো কখনো এই স্মৃতিগুলো আমাদের মনে পড়ে। আবার ছুটি শেষে যখন বাড়ি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে পা বাড়াই, তখন মন ভারী হয়ে ওঠে। আসলে দুই জায়গার প্রতি আলাদা একটা টান তৈরি হয়ে যায়।”
ঋতুর দাবি, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি সবার কাছে এক রকম নয়। শিক্ষার্থীভেদে ছুটির অনুভূতিও হয় আলাদা আলাদা। বাড়ির কাছাকাছি থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে ছুটি মানে একটু বিশ্রাম। আর দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য তা পরিবারের কাছে ফেরার তাগাদা। আবার অনেকে এমনও আছেন — যাদের ছুটি কাটে টিউশনি, চাকরি কিংবা ব্যক্তিগত ব্যস্ততায়। তাই ছুটির সংজ্ঞায় ব্যক্তিভেদে ফারাক গড়ে ওঠে।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে পড়ছেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সন্তান তাছকিন জাহান বৃষ্টি। বৃষ্টি জানান, ❝ক্যাম্পাসের দিনগুলো খুব ব্যস্ততায় পার হয়। তবে, ঘোরাঘুরি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, ক্লাস আর পরীক্ষার ধকল ছাপিয়ে যখন ছুটির ডেটটা চলে আসে — তখন শেকড় যেন আমাদের টেনে নিয়ে যায় বাড়িতে। এমনকি পূজা বা গ্রীষ্মে খুব অল্প সময়ের ছুটি হলেও দিনগুলো খুব আনন্দে কাটে আমাদের। মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ, পরিবারের সাথে বসে গল্প করার মুহূর্তের সঙ্গে কত আদর যত্নেই না থাকতে পারি আমরা কদিন! দিনগুলো কীভাবে যেন শেষ হয়ে যায়! ক্যাম্পাসের ব্যস্তময় জীবন থেকে ওই কয়টা দিনই যেন নিজের জন্য, আপনজনদের জন্য!❞
তিনি আরও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিগুলো আমার মতো হাজার হাজার শিক্ষার্থীর কাছে খুবই আনন্দদায়ক! পরিবার, আপনজন সব ছেড়ে আমরা অচেনা, অজানা এক শহরে থাকি পড়ালেখার জন্য। হাজারো খারাপ সময়ে আপনজনদের থেকে দূরে থাকার কষ্ট শুধু আমরাই বুঝি। তাই প্রতিটা ছুটি আমাদের জন্য বিশেষ কিছু। স্বপ্নের টানে যেমন আমরা এই ক্যাম্পাসে আসি, তেমনি পরিবারের টানে আমরা বাড়িতে ফিরি!”
নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার বাসিন্দা অন্তর কুমার। বেরোবির ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে ২০২৫-২৬ সেশনে পড়ছেন তিনি। অন্তরের দৃষ্টিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি মানেই এক মিশ্র অনুভূতির পসরা। ক্যাম্পাস জীবনের ব্যস্ততা, অ্যাসাইনমেন্টের চাপ আর পরীক্ষার দৌড়ঝাঁপ থেকে হঠাৎ একটুখানি মুক্তি। তবে এই ছুটির আমেজ সবার জন্য সমানভাবে আসে না। কারো বাড়ি অনেক দূরে, আবার কারো কাছে; কারো ছুটিতেও থাকে নানা ব্যস্ততা ও কর্মচাঞ্চল্য।
তাঁর মতে, “বাড়ি ফেরার পথেও সবসময় শিক্ষার্থীদের স্মৃতির পাতা সমৃদ্ধ হয়। আবার ছুটি শেষে বাড়ি ছাড়ার মুহূর্তে বেদনার অনুভূতি জেগে ওঠে। মায়ের হাতের রান্না, প্রিয়জনদের সান্নিধ্য আর শৈশবের বন্ধুদের সাথে আড্ডা — সব মিলিয়ে ছুটির দিনগুলো ভীষণ আনন্দের। তবে ছুটি শেষে যখন আবার ক্যাম্পাসে ফেরার সময় হয়, তখন চেনা মুখ ও প্রিয় গ্রাম ছেড়ে আসার কষ্টটা মনে দোলা দেয়।”
অন্তরের ভাষায়, ❝ফ্রেশার ও ফাইনাল ইয়ারের শিক্ষার্থীদের অনুভূতি কখনও এক হয় না। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের কাছে ছুটি মানে পরিবারকে সময় দেওয়ার আনন্দ, আর ফাইনাল ইয়ারের শিক্ষার্থীদের কাছে এটি এক নস্টালজিক অনুভূতি; কারণ তাদের বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসে। সঙ্গে ক্যারিয়ার ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা দানা বাঁধে। তাই এই ছুটিগুলো একেকজনের জীবনে একেক রকম অভিজ্ঞতার গল্প নিয়ে আসে। তাছাড়া, ছুটিগুলো আমাদের মানসিক ক্লান্তি দূর করে নতুন উদ্যমে পড়াশোনায় ফিরতে সাহায্য করে। এই মধুর স্মৃতিগুলো সারাজীবন মনে রাখার মতো।❞
তবে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছুটি তেমন একটা উপভোগ্য নয় শিক্ষার্থীদের জন্য। সেশনজটমুক্ত পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনার চাপ, দ্রুত সেমিস্টার শেষের তাগাদা আর কর্পোরেট প্রভাবের কারণে দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ঈদ, পূজা, গ্রীষ্ম বা শীতের ছুটির আমেজ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো অতটা সাড়া ফেলে না।
রাজধানীর ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাজমুস সাঈদ। তিনি ঢাকার মধ্য বাড্ডার বাসিন্দা। সাঈদ বলেন, ❝প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো করে তেমন দীর্ঘ ছুটি পাওয়া যায় না। এবারের পূজাতেও মাত্র তিন-চারদিন ছুটি পেয়েছি আমরা। তাই এই সময়টা আমাদের রিক্রিয়েশনের সময়। আমি এবার বই পড়ছি কয়েকটা এই ছুটিতে।❞
তিনি বলেন, “মূলত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট মুক্ত রাখার প্রবণতা থেকেই কম ছুটি রাখা হয়। একদিকে যেমন এর সুবিধা আছে। অপর দিকে, কিছুটা সমস্যাও আছে। অবশ্য আমার বাসা ঢাকাতেই হওয়ায় আমার তেমন একটা ভিন্নধর্মী কোনো অনুভূতি জাগে না, ঢাকার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বহু শিক্ষার্থীরই এই অবস্থা।”


